সংবাদ শিরোনাম

সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তুলতে যা করবেন

 প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৮ পূর্বাহ্ন   |   ধর্মীয় জীবন

সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তুলতে যা করবেন সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তোলার উপায়--প্রতিটি প্রতিকী ছবি

রোজিনা খাতুন :

সন্তান পরিবারের জন্য যেমন আনন্দ ও ভালোবাসার উৎস, তেমনি তার সঠিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠন বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই পরিবার, পরিবেশ ও আশপাশের মানুষের কাছ থেকে নানা বিষয় শেখে। তাই তার মধ্যে সত্যবাদিতা, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ, দয়া, ধৈর্য ও আল্লাহভীতির মতো গুণ তৈরি করতে পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়।

ইসলাম সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলে না; বরং তার ঈমান, চরিত্র ও নৈতিকতার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করে ধীরে ধীরে শিশুর মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

১. নিজে ভালো উদাহরণ তৈরি করুন

শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; তারা বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। তাই বাবা-মা যদি সন্তানের সামনে সত্য কথা বলেন, নামাজ আদায় করেন, অন্যকে সম্মান করেন এবং ধৈর্য ধরে কথা বলেন, তাহলে শিশুরাও সেসব আচরণ অনুকরণ করতে শেখে।

আল্লাহ বলেন—

قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

উচ্চারণ: Qu anfusakum wa ahlikum naran.

অর্থ: ‘তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’
—সূরা আত-তাহরিম, ৬

এই আয়াত পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্বের প্রতি সতর্ক করে।

২. ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর পরিচয় দিন

শিশুর মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা জরুরি। তাকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং আল্লাহ যে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, রিজিক দেন, বিপদে সাহায্য করেন এবং আমাদের ভালোবাসেন—এসব বিষয় সহজ ভাষায় বোঝানো যেতে পারে।

শিশুকে বলা যেতে পারে, ‘আল্লাহ আমাদের দেখেন’, ‘আল্লাহ ভালো কাজ পছন্দ করেন’, ‘কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখেন।’ এতে তার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।

৩. নামাজের অভ্যাস তৈরি করুন

নামাজ ইসলামী জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শিশুকে বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে নামাজের সঙ্গে পরিচিত করা উচিত। পরিবারের সবাই একসঙ্গে নামাজ পড়লে শিশুর মধ্যে নামাজের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ

উচ্চারণ: Muru awladakum bis-salati wa hum abna'u sab'i sinin.

অর্থ: ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।’
—সুনান আবু দাউদ

হাদিসটি শিশুকে ধীরে ধীরে নামাজের অভ্যাস করানোর গুরুত্ব তুলে ধরে।

৪. কুরআনের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করুন

শিশুর সঙ্গে প্রতিদিন অল্প সময় কুরআন পড়া যেতে পারে। প্রথমে ছোট সূরা, দোয়া ও সহজ অর্থ শেখানো ভালো। শুধু মুখস্থ করানোর পাশাপাশি আয়াতের অর্থ ও শিক্ষা সহজ ভাষায় বোঝানো হলে শিশুর মধ্যে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে।

উদাহরণ হিসেবে সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন-নাস ও সূরা ফাতিহা শেখানো যেতে পারে। পাশাপাশি খাবারের আগে-পরে, ঘুমানোর সময় ও বাইরে যাওয়ার সময়ের প্রয়োজনীয় দোয়াগুলো শেখানো যেতে পারে।

৫. সত্য কথা বলার শিক্ষা দিন

সত্যবাদিতা ইসলামী চরিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ। শিশু ভুল করলে তাকে এমনভাবে বোঝানো উচিত, যাতে সে ভয় পেয়ে মিথ্যা না বলে। বরং সত্য বললে তার প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করা হবে—এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ

উচ্চারণ: 'Alaykum bis-sidqi fa inna as-sidqa yahdi ilal-birr.

অর্থ: ‘তোমরা সত্যবাদিতা অবলম্বন করো; নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়।’
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

তাই বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণেও সত্যবাদিতার উদাহরণ থাকা প্রয়োজন।

৬. মানুষের প্রতি দয়া ও সম্মান শেখান

ইসলামী মূল্যবোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের প্রতি দয়া ও ভালো আচরণ। ছোটবেলা থেকেই শিশুকে বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে শেখাতে হবে।

একই সঙ্গে ছোটদের প্রতি স্নেহ, অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং প্রাণীর প্রতি দয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ

উচ্চারণ: Man la yarham la yurham.

অর্থ: ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

৭. ভালো বন্ধু নির্বাচনের শিক্ষা দিন

শিশুর চরিত্র গঠনে তার বন্ধু ও পরিবেশের প্রভাব অনেক। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের বিষয় দেখছে এবং কী ধরনের আচরণ শিখছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা দরকার।

তবে শুধু নিষেধ না করে ভালো বন্ধু ও সুন্দর পরিবেশের গুরুত্ব বোঝানো বেশি কার্যকর। তাকে এমন বন্ধু বেছে নিতে উৎসাহিত করতে হবে, যারা সত্যবাদী, ভদ্র ও ভালো কাজে আগ্রহী।

৮. শাস্তির পরিবর্তে ভালোবাসা ও বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দিন

সন্তান ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর আচরণ না করে ভুলের কারণ বোঝার চেষ্টা করা উচিত। শিশুকে অপমান বা অন্যের সামনে ছোট করা তার আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইসলামের শিক্ষা হলো কোমলতা ও উত্তম আচরণ। আল্লাহ বলেন—

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ

উচ্চারণ: Fa bima rahmatim minallahi linta lahum.

অর্থ: ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’
—সূরা আলে ইমরান, ১৫৯

তাই সন্তানকে সংশোধনের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও ভালোবাসার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

৯. দায়িত্ববোধ তৈরি করুন

বয়স অনুযায়ী শিশুকে ছোট ছোট দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। নিজের বই-খাতা গুছিয়ে রাখা, নিজের ঘর পরিষ্কার রাখা, বাবা-মাকে ছোট কাজে সহযোগিতা করা কিংবা সময়মতো পড়াশোনা ও নামাজের প্রস্তুতি নেওয়ার মতো অভ্যাস দায়িত্ববোধ তৈরি করে।

শিশুকে বোঝাতে হবে—প্রতিটি কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া একজন ভালো মানুষের গুণ।

১০. দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তুলুন

সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে নেক সন্তান লাভের জন্য একটি সুন্দর দোয়া রয়েছে।

رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ

উচ্চারণ: Rabbi hab li mil-ladunka zurriyyatan tayyibah, innaka sami'ud-du'a.

অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে সৎ সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।’
—সূরা আলে ইমরান, ৩৮

এ ছাড়া বাবা-মা নিজের ভাষায়ও সন্তানের ঈমান, চরিত্র, জ্ঞান ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন।

শেষ কথা

সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তোলা একদিনের কাজ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ভালোবাসা, শিক্ষা, অনুশাসন, দোয়া এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের নিজেদের সুন্দর আচরণ।

শিশুকে শুধু ‘এটা করো’ বা ‘ওটা করো’ বলার পরিবর্তে কেন ভালো কাজ করতে হবে, কেন সত্য বলতে হবে, কেন নামাজ পড়তে হবে এবং কেন অন্যের প্রতি দয়া করতে হবে—এসব বিষয় তার বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী বুঝিয়ে বলা উচিত।

একটি শিশুর সুন্দর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষালয় হলো পরিবার। তাই বাবা-মা নিজেরাই যদি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সুন্দর জীবনযাপনের চেষ্টা করেন, তাহলে সন্তানও সেই পরিবেশ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা লাভ করতে পারে।