সংবাদ শিরোনাম

ঋণ শোধ করতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন? জেনে নিন সহজ উপায়

কোরআন-হাদিসের আলোকে ঋণ পরিশোধের করণীয় ও ঋণের চাপ থেকে মুক্তির সহজ পথ

 প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন   |   ধর্মীয় জীবন

ঋণ শোধ করতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন? জেনে নিন সহজ উপায় ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পেতে কোরআন ও হাদিসের আলোকে করণীয়


ইসলামিক জীবন ডেস্ক:

মানুষের জীবনে নানা প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে ঋণ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধের দায়িত্বও তৈরি হয়। ইসলাম ঋণের বিষয়ে শুধু পাওনাদারের অধিকার নয়, ঋণগ্রহীতার দায়িত্ব এবং অসচ্ছল মানুষের প্রতি মানবিক আচরণেরও নির্দেশ দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে ঋণের লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর কেউ যদি সত্যিই আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে তাকে সামর্থ্য অর্জন করা পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

 ঋণের হিসাব লিখে রাখার নির্দেশ

সূরা আল-বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতকে ঋণ ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে ধরা হয়। নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ হলে তা লিখে রাখার কথা বলা হয়েছে। ন্যায়সংগতভাবে দলিল তৈরি এবং সাক্ষী রাখার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও প্রমাণ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়েছে। কারও কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার পরিমাণ, পরিশোধের সময় ও শর্ত পরিষ্কার থাকলে উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষণ করা সহজ হয়।

 অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়ার শিক্ষা

ঋণগ্রহীতা যদি সত্যিই আর্থিক সংকটে থাকেন, তাহলে তাকে চাপ না দিয়ে সময় দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে কুরআনে। আল্লাহ বলেন, **“যদি সে অসচ্ছল হয়, তবে স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও।”** একই আয়াতে ঋণ মাফ করে দেওয়াকে আরও উত্তম বলা হয়েছে। —সূরা আল-বাকারা, ২৮০।

অর্থাৎ একজন মানুষ সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়লে তার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক শিক্ষা।

 ঋণ নেওয়ার সময় নিয়তও গুরুত্বপূর্ণ

ঋণ নেওয়ার সময় মানুষের নিয়তের বিষয়টিও হাদিসে গুরুত্ব পেয়েছে। --সহিহ বুখারির ২৩৮৭ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধ করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, তার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।

এই হাদিস থেকে শিক্ষা হলো, ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই তা ফেরত দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা থাকা জরুরি। কারও অর্থ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তা আত্মসাৎ করার মানসিকতা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঋণকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই:

ঋণের গুরুত্ব বোঝাতে সহিহ বুখারিতে আরও একটি ঘটনা এসেছে। আবু যার (রা.) বর্ণিত হাদিসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পদ ব্যয়ের প্রসঙ্গে ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ আলাদা রাখার কথা বলেছেন। এতে বোঝা যায়, সম্পদের মালিক হওয়ার পাশাপাশি মানুষের পাওনা পরিশোধের দায়িত্বকেও গুরুত্ব দিতে হয়।তাই ঋণগ্রহীতার উচিত নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব করে পাওনা পরিশোধের জন্য পরিকল্পনা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত ঋণমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা।

পাওনাদারেরও রয়েছে মানবিক দায়িত্ব:

ইসলামে শুধু ঋণগ্রহীতাকেই দায়িত্বশীল হতে বলা হয়নি; পাওনাদারের জন্যও রয়েছে সহনশীলতার শিক্ষা।কুরআনে অসচ্ছল ব্যক্তিকে স্বচ্ছলতা পর্যন্ত সময় দেওয়ার নির্দেশের পাশাপাশি ঋণ মাফ করে দেওয়াকে আরও উত্তম বলা হয়েছে।এ ছাড়া সহিহ বুখারির একটি ঘটনায় দেখা যায়, ঋণ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) সমঝোতার পথ তৈরি করেছিলেন এবং পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিলেন।


 ঋণ পরিশোধে কী করণীয়:

কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঋণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা যেতে পারে—*১. ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা।**২. ঋণ নেওয়ার সময় পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত রাখা।****৩. নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ হলে লিখিত হিসাব রাখা।****৪. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা।****৫. সাময়িকভাবে পরিশোধে অক্ষম হলে পাওনাদারের সঙ্গে সত্যতা ও স্পষ্টতার সঙ্গে কথা বলা।****৬. প্রকৃত অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক হওয়া।**

ঋণমুক্তির জন্য দোয়া ---ঋণের চাপ থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলোর মধ্যে একটি হলো—

**اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ**

অর্থ: **হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে এবং ঋণের ভার ও মানুষের জুলুম থেকে আশ্রয় চাই।**

ঋণমুক্তির জন্য দোয়ার পাশাপাশি বাস্তব উদ্যোগও জরুরি—আয়-ব্যয়ের হিসাব করা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, পাওনাদারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত পরিশোধের চেষ্টা করা।


কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী ঋণকে অবহেলার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। ঋণ নেওয়ার সময় সৎ নিয়ত, লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং পরিশোধের ব্যাপারে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা সত্যিই অসচ্ছল হলে তাকে সময় দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে ইসলামের মানবিক শিক্ষা।

তাই ঋণ নেওয়া ও পরিশোধ—উভয় ক্ষেত্রেই সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহভীতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আরো পড়ুন----সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তুলতে যা করবেন