চোখের আলো নেই, তবু মদিনায় তিনি আলোকিত করছেন শত শত হৃদয়

 প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ অপরাহ্ন   |   ধর্মীয় জীবন

চোখের আলো নেই, তবু মদিনায় তিনি আলোকিত করছেন শত শত হৃদয়

তুষার রহমান: 

মসজিদে নববী তখন লোকে লোকারণ্য। চারদিক থেকে মানুষের স্রোত এসে মিলছে নবীজির পবিত্র আঙিনায়। কেউ জিকিরে মগ্ন, কেউ ঘুরে দেখছেন বরকতময় প্রাঙ্গণ, আবার কেউ তৃপ্তি নিয়ে পান করছেন জমজমের পানি। এমন পরিবেশে মৌমাছির মতো ছোট একটি জামাতের পাশে গিয়ে বসলাম। সেখানে একঝাঁক নির্মল চোখ নিবদ্ধ ছিল একটি নির্দিষ্ট দিকে। আমিও তাকালাম সেদিকে।

দেখলাম, একজন শায়খ হাদিসের দরস দিচ্ছেন। বিস্ময়ের বিষয়—তার দুই চোখই অন্ধ। জীবনে তিনি হয়তো কোনো দিন সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখেননি, দেখেননি জেদ্দার সাগরের ঢেউ কিংবা মদিনার অলিগলিতে ছুটে বেড়ানো বিড়াল-কবুতর। অথচ চোখের আলো না থাকলেও অন্তরের আলোয় তিনি অনর্গল পড়ে যাচ্ছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস।

হাতে স্পর্শ করে করে তিনি হাদিসের কিতাব পাঠ করছিলেন। আর চারপাশে চোখের আলো পাওয়া মানুষগুলো গভীর মনোযোগে শুনছিলেন তার দরস। দৃশ্যটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। মনে হলো, আল্লাহ কখনো কখনো মানুষের অন্তরে এমন এক আলো দান করেন, যার সামনে বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তিও যেন ম্লান হয়ে যায়।

মানুষের প্রতিভা ও দৃঢ় সংকল্প কতটা বিস্ময়কর হতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ যেন তিনি। কল্পনা করুন—একটি শিশুর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন কেটে যাচ্ছে দৃষ্টিহীনতার অন্ধকারে। চারপাশে প্রতিকূলতা, সামনে অনিশ্চয়তা; তবু সে হাল ছাড়ল না। বরং সিদ্ধান্ত নিল, এই অন্ধকার পেরিয়েই তাকে জ্ঞানের আলোর সন্ধান করতে হবে।

সেই সংকল্প থেকেই হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হওয়ার পথে যাত্রা শুরু। নানা বাধা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি সানাবিয়া (উচ্চমাধ্যমিক) সম্পন্ন করেন। এরপর হাদিসের উচ্চতর শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও অসংখ্য প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন একজন মুহাদ্দিস।

আজ সেই মানুষটিই মসজিদে নববীর পবিত্র প্রাঙ্গণে বসে চোখের আলোওয়ালা মানুষদের হাদিস শিক্ষা দিচ্ছেন। যে মসজিদে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা দিতেন, সেই ঐতিহাসিক পরিবেশে বসে তিনি নিজের অন্তরের আলো দিয়ে অন্যদের আলোকিত করছেন। সত্যিই, দৃশ্যটি ছিল বিস্ময় জাগানোর মতো।

দরসের একপর্যায়ে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই মহান বাণী তুলে ধরলেন—মানুষের মর্যাদা জাতি, বর্ণ কিংবা ভাষায় নয়; প্রকৃত মর্যাদা তাকওয়ার মধ্যে।

হাদিসের দরস শুনতে শুনতে মনে হলো, মসজিদে নববীর এই প্রাঙ্গণে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়গুলো কত সহজেই হারিয়ে যায়। এখানে ধনী-গরিব, আরব-অনারব কিংবা নানা দেশের মানুষের ভিড় থাকলেও সবার পরিচয় এক—তারা আল্লাহর বান্দা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মত।

এরপর একটি কাজে বাইরে যেতে হলো। এশার নামাজের সময় তখনো কিছুটা বাকি। কাজ শেষ করে ফিরে এসে দেখি, মসজিদ মুসল্লিতে পরিপূর্ণ। বাইরে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ হলো।

ইমামের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো মানুষ একযোগে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। মুহূর্তেই চারপাশে নেমে এলো অপার্থিব প্রশান্তি। যে প্রাঙ্গণে উসমান ইবনে আফফান (রা.), জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-সহ অসংখ্য সাহাবি নামাজ আদায় করেছেন, সেখানেই আমাকেও নামাজ পড়ার সুযোগ দেওয়ায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল।

নামাজ শেষে পাশে বসা এক আলজেরিয়ান ভাই হঠাৎ আমার হাত ধরলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, ‘ভয় পেয়ো না। আল্লাহর কাছে তাওবা করলে তিনি বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’

এরপর তিনি সুরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলেন—

إِنَّ اللهَ لا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ

অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; এর বাইরে অন্য যেকোনো গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।

একটু ভাবলে বিস্মিত হতে হয়—তিনি এসেছেন আলজেরিয়া থেকে, আর আমি অন্য এক ভূখণ্ড থেকে। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন—সবকিছুতেই রয়েছে নানা পার্থক্য। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা আমাদের মুহূর্তের মধ্যেই আপন করে দিল।

অল্প সময়ের এই সাক্ষাতেই তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করলেন—‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।’ হয়তো জীবনে আর কখনো তার সঙ্গে আমার দেখা হবে না। কিন্তু মদিনার কথা যখনই বন্ধুদের বলব, সেই অচেনা আলজেরিয়ান ভাইয়ের কথাও নিশ্চয় বলব।

হয়তো আমার বলা একটি কথায় কারও চিন্তায় সামান্য পরিবর্তন আসবে। হয়তো কেউ তাওবার পথে ফিরবে। আর সেই কল্যাণের অংশীদার হবেন সেই মানুষটিও, যিনি মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে আমাকে অল্প সময়ের জন্য হলেও আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। দাওয়াতের সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই—একটি ছোট্ট কথা কখন কার জীবনে বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা কেউ জানে না।

দীর্ঘ আলাপের একপর্যায়ে বিদায়ের সময় এলো। পকেটে থাকা একটি বিস্কুটের প্যাকেট তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘এটা আপনার জন্য হাদিয়া।’ মজার বিষয় হলো, বিস্কুটের প্যাকেটটিও আমি কিছুক্ষণ আগেই মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে অন্য একজনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম।

উপহারটি পেয়ে তিনি আনন্দিত হলেন। আমার জন্য দোয়া করলেন। এরপর নিজের পক্ষ থেকে আমাকে মদিনার তিনটি খেজুর উপহার দিলেন। আমিও তার জন্য দোয়া করলাম।

বিদায়ের সেই মুহূর্তে মনে হলো—দিলে পাওয়া যায়। একটি সামান্য বিস্কুটের প্যাকেটও যখন মানুষের হৃদয়ে আনন্দ তৈরি করতে পারে এবং বিনিময়ে ভালোবাসা ও দোয়া ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা যখন কিছু দিই, পরম করুণাময়ের পক্ষ থেকে তার প্রতিদান কত মহৎ হতে পারে!

মসজিদে নববীর সেই দিনটি তাই আমার কাছে শুধু একটি সফরের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। একজন দৃষ্টিহীন মুহাদ্দিস আমাকে দেখিয়েছেন—চোখের আলো না থাকলেও জ্ঞানের আলোয় মানুষ কতদূর যেতে পারে। আর এক অচেনা আলজেরিয়ান ভাই মনে করিয়ে দিয়েছেন—ভাষা ও ভূগোলের সীমা পেরিয়ে ঈমানের বন্ধন মানুষকে কত দ্রুত আপন করে নিতে পারে।

মদিনার সেই পবিত্র প্রাঙ্গণ থেকে পাওয়া শিক্ষা একটাই—আলো শুধু চোখে থাকে না; কখনো তা থাকে জ্ঞানে, কখনো হৃদয়ে, কখনো মানুষের একটি আন্তরিক কথায়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement