​কোরবানি: ত্যাগের মহিমায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অনন্য ইবাদত

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০১:৪৩ অপরাহ্ন   |   ধর্মীয় জীবন

​কোরবানি: ত্যাগের মহিমায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অনন্য ইবাদত

মাওলানা মো: আইনুল হক:

​ইসলামি শরিয়তে কোরবানি একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। এর মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর নির্দেশ পালনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করার মানসিকতা। ইতিহাসের পাতায় তাকালে আমরা দেখি, আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল থেকে কোরবানির সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই অভূতপূর্ব আত্মবিসর্জনের ঘটনা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য এক শাশ্বত শিক্ষা হয়ে আছে।

পবিত্র কোরআনের আলোকবর্তিকা ও ব্যাখ্যা

​পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ কোরবানির উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব স্পষ্ট করেছেন। সুরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: ​قُلۡ اِنَّ صَلَاتِیۡ وَ نُکِیۡ وَ مَحۡیَایَ وَ مَمَاتِیۡ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ​অর্থ: "বলো, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন-মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।"

​ব্যাখ্যা: এই আয়াতের মাধ্যমে মুমিন বান্দার জীবনের পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলিমের ইবাদত বন্দেগি থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস এবং মৃত্যু—সবই হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এখানে 'নুসুক' (কোরবানি) শব্দটিকে নামাজের সাথে যুক্ত করে এর বিশেষ মর্যাদা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ, পশুর রক্ত প্রবাহিত করা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি হৃদয়ের তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সমর্পণের বহিঃপ্রকাশ।

​সুন্নাহর নির্দেশনা ও কঠোর সতর্কবাণী

​নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, "নবীজি (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেছেন এবং প্রতিবছর কোরবানি দিয়েছেন।" (আহমদ ও তিরমিজি)।

​সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা এই ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে না আসে।" (ইবনে মাজাহ)

​এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, কোরবানি কোনো ঐচ্ছিক দান নয়, বরং সামর্থ্যবানদের জন্য এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় বা ওয়াজিব ইবাদত। কোরবানি না করে এর মূল্য দান করে দিলে এই ওয়াজিব আদায় হবে না; কারণ রক্ত প্রবাহিত করাই এখানে মূল ইবাদত।


​কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব?

​ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে একজন ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। বিষয়গুলো নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো: মৌলিক শর্ত: ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে এবং সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে।

​নিসাব ও সময়- ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যার কাছে 'নিসাব' পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

​নিসাবের পরিমাণ- ​স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি ও ​রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি এছাড়া, ​টাকা-পয়সা বা ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ।


​সম্পদের হিসাব: এক্ষেত্রে কেবল নগদ টাকা নয়; বরং সোনা-রুপা, অলঙ্কার, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, ঘর, ব্যবসায়িক পণ্য এবং অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের মূল্যও নিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে। যদি কারো কাছে পৃথকভাবে সোনা বা রুপা নিসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু সব মিলিয়ে (টাকা, সোনা ও আসবাবপত্র) রুপার নিসাবের সমমূল্য হয়, তবে তার ওপরও কোরবানি ওয়াজিব।

​একান্নবর্তী পরিবার ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা

​আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—পরিবারের কর্তার পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দিলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। কিন্তু শরিয়তের বিধান হলো, ব্যক্তিগত মালিকানা।

​একান্নবর্তী পরিবারে যদি একাধিক সদস্যের (যেমন পিতা, পুত্র বা স্ত্রী) প্রত্যেকের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে প্রত্যেকের পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা কোরবানি করা ওয়াজিব। বড় পশুর ক্ষেত্রে তারা পৃথক অংশ নিতে পারেন অথবা প্রত্যেকে আলাদা পশু কোরবানি করতে পারেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিবারের কেবল একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি দিলে অন্যদের ওয়াজিব আদায় হবে না।

​পরিশেষে: কোরবানি হলো আল্লাহর ভালোবাসার এক অগ্নিপরীক্ষা। লোক দেখানো মানসিকতা পরিহার করে কেবল মহান রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি করাই মুমিনের সার্থকতা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ত্যাগের মহিমায় কোরবানি করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement