ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে: সওয়াবের কাজ নাকি সামাজিক অপরাধ? শায়খ আহমাদুল্লাহর সাহসী বয়ান
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আমাদের সমাজে একজন নারী বিধবা হলে কিংবা তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে যেন পৃথিবীর সব অন্ধকার তার ওপর এসে ভর করে। সেই নারীকে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখানো তো দূরের কথা, কেউ যদি তাকে বিয়ে করে তবে সমাজ ও পরিবার তাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে। সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক ব্যক্তির এক হৃদয়স্পর্শী প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট আলেম শায়খ আহমাদুল্লাহ এই সামাজিক কুসংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন।
এক যুবকের আর্তনাদ ও শায়খের সান্ত্বনা
মাহফিলে আসা এক যুবক আক্ষেপ করে শায়খকে প্রশ্ন করেন, "আমি একজন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করে কি ভুল করেছি? আমার পরিবার ও এলাকার মানুষ আমাদের নিয়ে আজেবাজে কথা বলছে।"
যুবকের এই প্রশ্নটি ছিল বর্তমান সমাজের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নামাজী বা ধার্মিক দাবি করা অনেক মানুষের মধ্যেও এই নিচু মানসিকতা বিদ্যমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "একজন যুবক কোনো ডিভোর্সি বা বিধবা নারীকে বিয়ে করলে তিনি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ করেছেন। এটা কোনো ভুল নয়, বরং রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের সুন্নাহর অনুসরণ।"
বিবাহবিচ্ছেদ মানেই কি নারীর দোষ?
সমাজে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো, তালাক হওয়া মানেই সেই নারীর কোনো চারিত্রিক সমস্যা ছিল। এই প্রসঙ্গে শায়খ বলেন, বিবাহবিচ্ছেদ কেবল স্ত্রীর কারণে হয় না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের শিকার হয়ে নারীরা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "তালাকপ্রাপ্তা একজন নারী এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। তার ওপর সমাজের কটু কথা ও তাচ্ছিল্য সেই মজলুম নারীর অন্তর থেকে যে দীর্ঘশ্বাস বের করে আনবে, তা আপনাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।"
নবীজি (সা.) ও সাহাবীদের আদর্শ
শায়খ আহমাদুল্লাহ ইসলামের সোনালী ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ইসলামের শ্রেষ্ঠতম মানুষরা বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা নারীদের সম্মান দিয়ে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ব্যতীত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল স্ত্রীই ছিলেন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা। তাই এই ধরনের বিয়েকে যারা বাঁকা চোখে দেখে, তারা মূলত নবীজির সুন্নাহকেই অবজ্ঞা করছে।
বৃদ্ধ বয়সে বিয়ে ও সন্তানদের ‘স্বার্থপরতা’
আলোচনায় শায়খ কেবল নারীদের অধিকার নয়, বরং বিপত্নীক বয়স্ক পুরুষদের অধিকার নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, বৃদ্ধ বয়সে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু দেখা যায়, বাবার এই একাকীত্ব ঘোচানোর পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের সন্তানরাই। এই আচরণকে তিনি ‘অত্যন্ত স্বার্থপর’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং সমাজ থেকে এই কুসংস্কার দূর করার আহ্বান জানান।
ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও সমাজের দায়বদ্ধতা
শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, যারা ভালো কাজ নিয়ে হাসাহাসি করে, তারা গর্হিত গুনাহের কাজ করছে। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে ডিভোর্সি বা বিধবা নারীদের সামাজিক ও চারিত্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। তিনি বলেন:
"একজন নারী যার স্বামী নেই, তিনি যদি নিজের চরিত্র রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে পুনরায় বিয়ে করেন, তবে তাকে উপহাস নয় বরং স্যালুট জানানো উচিত।"
পরিশেষে,
ইসলাম যেখানে মানবিকতা এবং সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়, সেখানে সামাজিক প্রথা বা কুসংস্কারের দোহাই দিয়ে কাউকে হেয় করা ধর্মীয় দৃষ্টিতেও অপরাধ। শায়খ আহমাদুল্লাহর এই আলোচনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক যুগে বাস করেও আমরা চিন্তাভাবনায় কতটা পিছিয়ে আছি। সময় এসেছে আমাদের চিন্তাধারাকে উন্নত করার এবং সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার।