পশ্চিম তীরে নতুন অবৈধ বসতি গড়ছে ইসরায়েলিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে রামাল্লাহর কাছে নতুন একটি অবৈধ বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। একই সময়ে নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা গ্রামে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি ঘিরে বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে।
রোববার রামাল্লাহর উত্তর-পশ্চিমে উম্ম সফা গ্রামের কাছে ওয়াদি জায়তুন এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা তাঁবু খাটিয়ে নতুন একটি আউটপোস্ট গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে। আলজাজিরার প্রতিবেদক থারওয়াত শাকরা জানান, একই দিন বুরকা গ্রামেও পৃথক একটি নতুন আউটপোস্ট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আউটপোস্ট দুটি প্রতিষ্ঠিত হলে উম্ম সফা ও বুরকা—এই দুই প্রতিবেশী গ্রামের চারপাশে অবৈধ আউটপোস্টের সংখ্যা বেড়ে ছয়টিতে দাঁড়াবে।
শাকরার তথ্য অনুযায়ী, উম্ম সফার ৪ হাজার ৮০০ দুনামের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ দুনাম এবং বুরকার ১২ হাজার দুনামের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার দুনাম বসতি স্থাপনকারীরা দখলে নিয়েছে।
কুসরায় অবরোধ দ্বিতীয় সপ্তাহে
নাবলুসের দক্ষিণে কুসরার রাস আল-আইন এলাকায় তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পড়েছে। ১৫ ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে দুই শিশু, এখনো নিজেদের বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা সেখানে অবস্থান পরিবর্তন করে বাসিন্দাদের বাড়ির সামনে একটি তাঁবু স্থাপন করেছে। এর আগে বসতি স্থাপনকারীরা সেখানে তাঁবু স্থাপনের চেষ্টা করলে সেনারা সেটি দুই দিন ধরে খুলে ফেলেছিল।
পরে পৌরসভার কর্মীরা অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ আবার চালু করতে সক্ষম হন।
পশ্চিম তীরে হামলা ও গ্রেপ্তার
রোববার পশ্চিম তীরের বেইত ইমরিন শহরে একটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভেতরে থাকা লোকজনকে আটকে রাখে বসতি স্থাপনকারীরা। পরে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে গিয়ে বাড়ি থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করে এবং সেখান থেকে চলে যায়।
ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছাতে যাওয়া রেড ক্রিসেন্টের দলকেও ইসরায়েলি সেনারা বাধা দেয়। শাকরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সহায়তার গাড়িগুলোর চাবিও জব্দ করা হয়।
রামাল্লাহ জেলার নাবা আল-কাবনেহ এলাকায়ও বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়েছে। তুরমুস আয়া এলাকায় একটি বাড়িতে ঢোকার চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। হেবরনের আল-জাবারি এলাকায় হামলায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন; ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন গুলিতেও আহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি আলজাজিরাকে জানিয়েছে, অবৈধ বসতি স্থাপনের এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী গ্রেপ্তার বাড়িয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের হামলার বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিচ্ছেন, তাদেরও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
‘জাতিগত নিধনে বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার’
জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজি বলেছেন, কুসরায় তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের ওপর অবরোধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে হবে।
রোববার আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালানোর অধিকার ইসরায়েলের নেই; বরং বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে তাদের।
তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।
আলবানিজির ভাষায়, ইসরায়েল ‘জবরদস্তির কাজ বসতি স্থাপনকারীদের হাতে তুলে দিয়েছে’ এবং পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন এগিয়ে নিতে তাদের ব্যবহার করছে। তিনি এই কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে বসতি স্থাপনকারীদের তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়তো জাতিগত নিধন; আর ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাকে তিনি ‘নাকবা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতিদিন ৩০ হামলার অভিযোগ
ফিলিস্তিনিয়ান ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘৌতি পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি দাবি করেন, বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো প্রতিদিন গড়ে ৩০টি হামলা চালাচ্ছে। তাঁর মতে, এসব গোষ্ঠী ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযানের অগ্রভাগে রয়েছে।
বারঘৌতি বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে আরব দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলা আরও বেড়েছে। বর্তমানে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১৫৬টি অবৈধ বসতি ও ৩৬০টি অবৈধ আউটপোস্টে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন।
জাতিসংঘের অবস্থান অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ।
সূত্র:আলজাজিরা