কুসরায় ইসরায়েলি অবরোধে পানিহীন ১৫ ফিলিস্তিনি

 প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কুসরায় ইসরায়েলি অবরোধে পানিহীন ১৫ ফিলিস্তিনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৫ ফিলিস্তিনি তিনটি বাড়ির ভেতর আটকে আছেন। তাদের মধ্যে দুইজন শিশু। সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী ও ইসরায়েলি সেনাদের ঘেরাওয়ের কারণে পরিবারগুলো খাবার, পানি ও বিদ্যুৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ওই বাসিন্দারা ‘ভীতিকর পরিস্থিতিতে নিজেদের বাড়ির ভেতর আটকে আছেন’। তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ নেই, এমনকি পানি ও বিদ্যুতেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

পানি পৌঁছাতেও বাধা

রোববার পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে। অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে ইউনিসেফের একটি বহর যাওয়ার চেষ্টা করলে ইসরায়েলি সেনারা সেটি আটকে দেয়। দুটি গাড়ি প্রবেশ করতে পারায় খাবারের সংকট সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও সেনারা একটি পানির ট্যাংকারকে বাড়িগুলোর কাছ থেকে সরিয়ে দেয়।

এর আগের দিন বসতি স্থাপনকারীরা পৌরসভার কর্মী ও একটি বুলডোজারের ওপর হামলা চালায়। তারা পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ মেরামতের চেষ্টা করছিল।

কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি বলেন, অবরুদ্ধ তিনটি বাড়িতে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, মানবাধিকার, শিশু অধিকার ও নারীর অধিকারের কথা বিশ্বজুড়ে অনেক শোনা যায়। কিন্তু জাবাল রাস আল-আইনের পরিবারগুলোর সঙ্গে যা ঘটছে, তা মানবিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

কুসরা থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক লাইথ জার জানান, অবরোধ কার্যকর করতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সরাসরি ভূমিকা রাখছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের সহযোগিতা করছে এবং ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

‘আমরা এখান থেকে যাব না’ অবরোধের মধ্যেও বাড়িঘর ছেড়ে যেতে রাজি নন বাসিন্দারা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পাহাড়ের চূড়ায় একটি বাড়িকে সামরিক ব্যারাকে পরিণত করেছে এবং এলাকাটিকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংহতি কর্মী ও ইসরায়েলি সংগঠন পিস নাউয়ের সদস্যদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, শহরের পশ্চিম প্রান্তে হিলটপ ইয়ুথ নামের একটি গোষ্ঠীর স্থাপন করা অবৈধ বসতি উচ্ছেদের জন্য জারি করা নয়টি আদেশ কার্যকর করতে সেনাবাহিনী অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ওই বসতি থেকেই সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবরুদ্ধ বাসিন্দা কুসাই আবু রেইদা আলজাজিরাকে বলেন, খাবার, পুষ্টিকর সামগ্রী ও ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া হলেও তারা বাড়ি ছাড়বেন না। প্রয়োজনে পানি ও লবণ খেয়েও সেখানে থাকার প্রত্যয় জানান তিনি।

আবু রেইদা বলেন, নিজেদের পূর্বপুরুষের জমি ছেড়ে দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। তিনি প্রতিবেশী ইউসুফ ও রিজকের সঙ্গে বাড়ি না ছাড়ার অঙ্গীকার করেছেন বলেও জানান।

‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের নকশা’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা কুসরার অবরোধকে বৃহত্তর পরিসরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের একটি পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখছেন।

প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘৌতি বলেন, এই অভিযানের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো জমি দখল করা, বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে ওই এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া।

তবে তাঁর মতে, এর কৌশলগত লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। কুসরায় যা ঘটছে, পশ্চিম তীরের অন্যান্য গ্রামেও একই ঘটনা ঘটতে পারে-এমন বার্তা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি মনে করেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, নীতি ও প্রচারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রোসাসও কুসরার পরিস্থিতিকে বসতি স্থাপনকারীদের ‘সমন্বিত ও পরিকল্পিত সন্ত্রাসের’ ক্রমবর্ধমান ধারার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই সহিংসতা ইসরায়েল রাষ্ট্রের সহায়তা, সমর্থন ও অর্থায়নে চলছে।

অক্টোবর ২০২৩ থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণও দ্রুত বেড়েছে। ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের হিসাবে, ওই সময়ের পর থেকে বসতি স্থাপনকারীরা ৩০০টির বেশি নতুন অবৈধ আউটপোস্ট স্থাপন করেছে। একই সময়ে ইসরায়েল সরকার ১০৪টি নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনাও এগিয়ে নিয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement