জেরুজালেমে কফি ঘিরে ইসরায়েলের সামাজিক বিভাজন

 প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

জেরুজালেমে কফি ঘিরে ইসরায়েলের সামাজিক বিভাজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

জেরুজালেমের একটি ক্যাফেতে শনিবার বা ইহুদিদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিন ‘শাবাত’-এ ব্যবসা চালানোকে কেন্দ্র করে ধর্মনিরপেক্ষ ও অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদিদের মুখোমুখি অবস্থান ইসরায়েলের গভীরতর সামাজিক বিভাজন সামনে এনেছে।

গত জুন থেকে প্রতি সপ্তাহে মধ্য জেরুজালেমের ক্যাফে বাসিমতার সামনে বিক্ষোভ করছেন অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদিরা। শাবাতে ক্যাফে খোলা রাখায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ‘শাবাত’ স্লোগান দিতে দিতে সেখানে জড়ো হন। শনিবারও কয়েক ডজন পুরুষ ও কিশোর বিক্ষোভে অংশ নেয়।

তবে এবার তাদের পাল্টা বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিরা বাঁশি বাজিয়ে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কারও পোশাকে ছিল প্রতিবাদী ব্যাজ, আবার একজনের হাতে ছিল লেখা-‘কফি পান করার আমাদের পবিত্র অধিকার’।

জেরুজালেমের একটি রাস্তায় মুখোমুখি এই সংঘাত ইসরায়েলি সমাজের দুই ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ধর্ম, রাজনীতি ও সামরিক সেবাকে ঘিরে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সামরিক সেবা নিয়ে ক্ষোভ

ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের ক্ষোভের বড় কারণ অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি। ধর্মীয় পড়াশোনার জন্য তারা সরকারি ভাতাও পান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থনে এই সুবিধা বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে সামরিক সেবা থেকে অতি-ধর্মানুরাগীদের অব্যাহতি নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।

২০ বছর বয়সী আলমা রোনেন গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে লড়াই করেছেন। তিনি বলেন, সমাজের একটি অংশকে সেনাবাহিনীতে যেতে ও সেবা দিতে হচ্ছে, অথচ অন্যরা শুধু নিজেদের জীবনযাপন নিয়েই ব্যস্ত-এতে তাঁর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ক্যাফের সামনে কফি কেনার জন্য অপেক্ষায় থাকা ৭৭ বছর বয়সী আমিত ইয়ারও অতি-ধর্মানুরাগীদের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, তারা সরকারের কাছ থেকে অর্থ নিতে চান এবং ইসরায়েলকে ইহুদি ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান।

‘আমার পরিবারের বিশ্বাসে আঘাত’

ক্যাফেটি এমন একজন ব্যক্তি চালু করেছেন, যিনি ইহুদিদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের পক্ষে। অনেক ইহুদি এই আন্দোলনকে অপছন্দ করলেও ক্যাফের সাধারণ গ্রাহকদের কাছে মালিকের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অতি-ধর্মানুরাগী এক বিক্ষোভকারী বলেন, তিনি ইচ্ছা করেই ধর্মীয় এলাকায় বসবাস করেন। তাঁর সন্তানরা বাড়ি থেকে বের হয়ে একটি ক্যাফে খোলা দেখতে পাক-এটি তিনি চান না।

তাঁর ভাষায়, বিষয়টি কাউকে অসম্মান করার নয়; বরং তাঁর পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত। শাবাত পালনের বিষয়টি ইহুদি পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদিদের অনেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, শাবাতের দিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা ধর্মীয় বিধানের লঙ্ঘন।

সমাজ এগোচ্ছে দুই বিপরীত দিকে

জিউইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউটের গত বছরের এক গবেষণা অনুযায়ী, ইসরায়েলের ৫৩ শতাংশ ইহুদি নিজেদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মনে করেন।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ধর্ম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান শ্লোমিত রাভিৎসকি তুর-পাজ বলেন, ইসরায়েলি সমাজ ধীরে ধীরে আরও ধর্মনিরপেক্ষ হয়েছে। শাবাতে বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় গণপরিবহন চালু থাকা এবং এলজিবিটিকিউ অধিকার গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার বিষয়টি এর উদাহরণ।

তবে জনসংখ্যাগত দিক থেকে একই সময়ে উল্টো প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় ইহুদিদের সংখ্যা বাড়ছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ হামলার পর ইসরায়েলি সমাজ আরও ধর্মমুখী ও ডানপন্থী হয়েছে।

নেতানিয়াহুর সরকারে অতি-ধর্মানুরাগী দলগুলোর প্রভাব নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। বিতর্কিত বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ এবং ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিচালনায় তাদের ভূমিকা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের সমালোচনা তীব্র হয়েছে।

নির্বাচনে সামরিক অব্যাহতি বড় ইস্যু

নেতানিয়াহুর প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন পক্ষগুলো অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদিদের সামরিক সেবার অব্যাহতি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ধর্মনিরপেক্ষ কর্মী আইয়া লেভকোভিচ বলেন, শাবাত কীভাবে পালন করবেন, সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যেকের নিজের হওয়া উচিত। সরকারের সমর্থন পাওয়া একটি ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অন্যদের ওপর জীবনযাপনের ধরন চাপিয়ে দিক-এটি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কয়েক ঘণ্টার উত্তপ্ত বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভের পর অতি-ধর্মানুরাগী বিক্ষোভকারীরা সরে যান। তবে তারা পরের শনিবার আবারও বিক্ষোভ করার পরিকল্পনা করছেন।

এদিকে ক্যাফেটিকে ঘিরে বিরোধ যত পরিচিত হচ্ছে, সেখানে কফি পান করতে আসা মানুষের সারিও তত দীর্ঘ হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement