সুদানে যুদ্ধ থামাতে আফ্রিকান ইউনিয়নের নতুন উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সুদানে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ ফেরাতে দুই দিনের মাঠপর্যায়ের সফর শুরু করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)। রোববার সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল সুদানে পৌঁছেছে। তবে দেশটির যুদ্ধরত পক্ষগুলোর গভীর সামরিক ও কূটনৈতিক বিভাজনের কারণে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা পরিষদ (পিএসসি) সুদানের কর্তৃপক্ষ ও সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ানো এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি করাই এই সফরের প্রধান লক্ষ্য।
তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে সুদানে কয়েক দশক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এবারের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পক্ষই এখনো চূড়ান্ত জয় পায়নি।
যুদ্ধের বর্তমান চিত্র
সুদানের রাজধানী খার্তুমের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ)। তবে পশ্চিমাঞ্চলের দারফুরের বড় অংশে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)।
মধ্য, পশ্চিম ও দক্ষিণ সুদানকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল কর্দোফানও এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। খার্তুমের আশপাশে সেনাবাহিনীর অগ্রগতি যুদ্ধের ভারসাম্য কিছুটা বদলালেও আরএসএফকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
কর্দোফানের নিয়ন্ত্রণ দুই পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটির মধ্য দিয়ে এসএএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকার সঙ্গে পশ্চিম সুদানের যোগাযোগ এবং সরবরাহপথ পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে দারফুর থেকে অন্য এলাকায় যোদ্ধা ও সামরিক সরঞ্জাম সরানোর ক্ষেত্রে আরএসএফের সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।
ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের এই অচলাবস্থাই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় বাধা। কোনো পক্ষই যখন মনে করছে না যে তারা শিগগিরই পরাজিত হবে, তখন আপসের প্রেরণাও কম।
এইউ কী অর্জন করতে চায়
শান্তি ও নিরাপত্তা পরিষদের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত এসএএফ ও আরএসএফকে যুদ্ধবিরতির দিকে নেওয়া, দ্বিতীয়ত মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা এবং তৃতীয়ত এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ধরে রাখা, যা দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বাইরে সুদানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন বারবার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুদানিদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ শুধু যুদ্ধ থামালেই সংকটের সমাধান হবে না।
২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সুদানে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ২০২১ সালের অক্টোবরে সামরিক বাহিনী সেই ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার পর সংকট আরও গভীর হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বেসামরিক শাসনে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে এসএএফ ও আরএসএফের দ্বন্দ্ব থেকেই বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয়।
এইউর সামনে তাই দুটি কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ—মানবিক সহায়তা ও আলোচনার জন্য যুদ্ধের তীব্রতা কমানো এবং এমন কোনো সমঝোতা ঠেকানো, যা শুধু দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ও ভূখণ্ড ভাগাভাগির চুক্তিতে পরিণত হবে।
আগের উদ্যোগগুলো কেন ব্যর্থ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সুদান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। ২০২৩ সালের মে মাসে পিএসসি স্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরার জন্য একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করে।
ওই মাসেই সৌদি আরবের জেদ্দায় এসএএফ ও আরএসএফ বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিয়ে কিছু প্রতিশ্রুতিতে সই করেছিল। কিন্তু সেসব চুক্তি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে পিএসসি আবার কায়রো ও পোর্ট সুদানে মাঠপর্যায়ের সফর করে। তখনও যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
সমস্যা তাই উদ্যোগের অভাবে নয়; বরং দুই পক্ষকে ছাড় দিতে রাজি করানোতেই। উভয় পক্ষই এখনো মনে করে, যুদ্ধক্ষেত্রে আরও সুবিধা আদায় করা সম্ভব।
জাতিসংঘ, পূর্ব আফ্রিকার আঞ্চলিক সংগঠন ইন্টারগভর্নমেন্টাল অথরিটি অন ডেভেলপমেন্ট (আইজিএডি) এবং জেদ্দা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবও মধ্যস্থতায় যুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে আরও সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন।
চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা কতটা
কূটনৈতিকভাবে আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রভাব থাকলেও এসএএফ ও আরএসএফকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নাইজেরিয়ার স্টেট সিকিউরিটি সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক ডেনিস আমাচরি আলজাজিরাকে বলেন, এককভাবে দুই পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার মতো প্রভাব আফ্রিকান ইউনিয়নের নেই।
তাঁর মতে, চাপ প্রয়োগের জন্য এইউর কার্যকর কোনো প্রয়োগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আর্থিক প্রভাব কিংবা প্রস্তুত সামরিক বাহিনী নেই।
ফলে আফ্রিকান ইউনিয়নকে কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বৈধতাকে এমন কার্যকর চাপে পরিণত করা, যাতে এসএএফ ও আরএসএফের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে আলোচনায় বসা বেশি লাভজনক মনে হয়।
সফর কি অচলাবস্থা ভাঙতে পারবে
আফ্রিকান চেম্বার অব কনটেন্ট প্রডিউসার্সের বেঞ্জামিন ডাওমোহ-ডয়েন বলেন, এই সফর আফ্রিকান নেতৃত্বে সমাধানের দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তাঁর মতে, সুদানের সংকটের স্থায়ী সমাধানে আফ্রিকান নেতৃত্বে আফ্রিকানদের মালিকানাধীন উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তবে শুধু আফ্রিকান নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধের অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব হবে না। এসএএফ ও আরএসএফকে বোঝাতে হবে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে তারা এমন কিছু পেতে পারে, যা অব্যাহত যুদ্ধ তাদের দিতে পারবে না।
দুই দিনের এই সফরেই সুদানের সংকটের সমাধান হবে না। সফরের গুরুত্ব নির্ভর করবে প্রতিনিধি দল চলে যাওয়ার পরও তাদের পাওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা কার্যকর থাকে এবং আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয় কি না, তার ওপর।
নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বীকন কনসাল্টিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা কবির আমাদুর মতে, সুদানের যুদ্ধ এখন সমাধানের বদলে দুই পক্ষের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ ও বাইরের পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়ায় উভয় পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে, কিন্তু কেউই চূড়ান্ত জয় পাচ্ছে না।
তাঁর মতে, আফ্রিকান ইউনিয়নের চ্যালেঞ্জ হলো এই সামরিক অচলাবস্থাকে কূটনৈতিক গতিতে রূপ দেওয়া, যাতে তা সুদানের স্থায়ী বিভাজনে পরিণত হওয়ার আগেই রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা যায়।
সূত্র: আলজাজিরা