পশ্চিম তীরে পুলিশকে ক্ষমতা দিচ্ছে ইসরায়েল সরকার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ইসরায়েলি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কার্যত সংযুক্তিকরণ, বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
শুক্রবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দেশটির সামরিক বাহিনীকে পশ্চিম তীরে বেসামরিক আইন প্রয়োগের দায়িত্ব ইসরায়েলি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎস জানিয়েছে, কুসরা গ্রামের একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা অবরোধ করার ঘটনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ বলেন, সেনাবাহিনীর কাজ ফিলিস্তিনি ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করা, বসতি স্থাপনকারী তরুণদের পেছনে ছোটা নয়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের বেসামরিক বিষয় সামলাতে পুলিশ একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করবে।
তবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই কাঠামোগত পরিবর্তন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ সংযুক্তিকরণকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন ও উচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়াবে।
ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘৌতি বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার ও ইহুদিকরণ প্রক্রিয়ার ‘অগ্রভাগে’ রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির সময় ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার সঙ্গেও তিনি বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন।
বারঘৌতির অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের হাতে নিরাপত্তা এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের নিয়ন্ত্রণে অবৈধ বসতিগুলোর বিষয় তুলে দেওয়া কার্যত পশ্চিম তীরকে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার শামিল।
কার্যত সংযুক্তিকরণের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক দখলদারির আইনি কাঠামোর বদলে বেসামরিক আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা চালু হলে পশ্চিম তীরের আইনি অবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।
ইসরায়েলবিষয়ক গবেষক মোহানাদ মুস্তাফা বলেন, ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরকে আর অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করছে না। বেসামরিক পুলিশের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অর্থ হলো, সরকার কার্যত পশ্চিম তীরকে সংযুক্ত করে নিচ্ছে।
তাঁর মতে, এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সেনাবাহিনীর ওপর থাকা কিছু দায়িত্বও পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব চলে যাবে বেন-গভিরের নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশের হাতে।
ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব হুসেইন আল-শেখ বলেন, এটি আন্তর্জাতিক চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আইন ও সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসও এই সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে পশ্চিম তীরে কার্যত সংযুক্তিকরণের পথ আরও প্রশস্ত হবে এবং বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলা ও অপরাধের জন্য বাড়তি সুরক্ষা তৈরি হবে।
বসতি স্থাপনকারীদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়ার ফলে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এর আগে ইসরায়েলি সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় মদদ দেওয়ার অভিযোগ করেছে।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিহাদ আবু গোষের মতে, সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিরোধ নেই। তাঁর ভাষায়, বসতি স্থাপনকারীদের একটি অংশ এখন এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, যারা রাষ্ট্রের হয়ে এমন কাজ করে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে করা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীরে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করার চেষ্টা চলছে।
বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অভিযোগ
বেসামরিক পুলিশকে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে পশ্চিম তীরে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি হবে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলবিষয়ক গবেষক শাদি আল-শুরাফা বলেন, পশ্চিম তীরে একই ভূখণ্ডে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে দুই ধরনের আইন কার্যকর হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি প্রকাশ্য বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ করে তাদের বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা।
আরেক বিশ্লেষক আদেল শাদিদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর শুধু সংযুক্তিকরণের সম্ভাবনার মধ্যে নেই; বরং এমন একটি বাস্তবতা তৈরির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
এই পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে সমালোচনা করেছেন তারা।
শাদিদ সম্প্রতি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দাকে কেবল লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, পশ্চিম তীরে চলমান প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্তমান ডানপন্থী সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে সমন্বয় আছে।
সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও ব্রিটেন প্যালেস্টাইন প্রজেক্টের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু হুইটলি বলেন, পশ্চিম তীরে পুলিশের কাছে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
হুইটলির ভাষায়, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ‘চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে’। শুধু উদ্বেগ প্রকাশ না করে পরিস্থিতি ঠেকাতে কার্যকর নিষেধাজ্ঞাসহ বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা