সম্পদ লুটে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখছে সুদানের পক্ষগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সুদানের প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্যপথ ও পণ্য নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির যুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষই অর্থ জোগাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) বলেছে, এই ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’ সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে ভয়াবহ লড়াই চলছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এক কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
দেশটির বেশ কয়েকটি অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ। তবে যুদ্ধ থামার বদলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক উৎস থেকে আয় করে দুই পক্ষই সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বলেন, সুদানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সংঘাত উসকে দিচ্ছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “এই যুদ্ধ অর্থনীতিকে ভেঙে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নজর দিতে হবে সেই পণ্য ও বাণিজ্যপথের দিকে, যেগুলো এই সংঘাতকে টিকিয়ে রাখছে।”
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সুদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য গাম অ্যারাবিকের বাণিজ্যকে। গাম অ্যারাবিক হলো গাছ থেকে পাওয়া এক ধরনের প্রাকৃতিক আঠা, যা কোমল পানীয়, প্রসাধনী ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী কাঁচা গাম অ্যারাবিক রপ্তানির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সরবরাহ করত সুদান। পণ্যটি দেশটির লাখো মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস।
তবে যুদ্ধের পর এই বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাম অ্যারাবিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ লুটপাট, চাঁদাবাজি, বেআইনি আটক ও হুমকির শিকার হয়েছেন।
২০২৫ সালের মে মাসে পশ্চিম কোরদোফান রাজ্যের এল-নুহুদ শহরে গাম অ্যারাবিক এক্সচেঞ্জ, গুদাম এবং স্থানীয় বাজারের একটি অংশ আরএসএফের হামলায় লুট হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় রপ্তানির জন্য প্রস্তুত বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত ছিল।
জাতিসংঘ বলছে, যুদ্ধের কারণে সুদানের গাম অ্যারাবিক বাণিজ্য এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পণ্যগুলো পোর্ট সুদানের মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে।
অন্যদিকে আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গাম অ্যারাবিক সীমান্তপথে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হচ্ছে। পরে সেগুলো স্থানীয় পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা হলে উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভলকার টুর্ক আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকার পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনে যেন কোনো প্রতিষ্ঠান পরোক্ষভাবে সহায়তা না করে।
তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের উৎস যাচাই, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সংঘাতপূর্ণ বাণিজ্যচক্র থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, “স্বাভাবিক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, যখন সেই সরবরাহ ব্যবস্থা যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।”