যুদ্ধবিরতি হলেও ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে লাগতে পারে কয়েক বছরে
আন্তর্জাতিক সংবাদ:
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ চললেও ইরানের অর্থনীতির সামনে স্বস্তির পথ এখনও দীর্ঘ। এক বছরের মধ্যে দুটি যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি দেশটির অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে সমঝোতা হলেও পরিস্থিতি এখনও অস্থির। হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে আবারও আলোচনার প্রস্তুতি চলছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরপর উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ থেমে গেলেও অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত কাটবে না। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, কঠোর নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ এবং যুদ্ধের ধাক্কা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সরকারি তথ্য বলছে, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮৮.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৩৪ শতাংশ। ভোজ্য তেল, মাংস, রুটি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তীব্রভাবে কমেছে।
বেকারত্বের সরকারি হার ৭.৫ শতাংশ হলেও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ মাত্র ৪০ শতাংশ। বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন। অন্যদিকে ন্যূনতম মাসিক মজুরির মূল্য বর্তমানে প্রায় ৯৫ মার্কিন ডলারের সমান, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম।
বাজেট ঘাটতির কারণে সরকার সীমিত পরিসরে নগদ সহায়তা ও খাদ্য কেনার জন্য ইলেকট্রনিক কুপন দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ইরানের অর্থনীতি ০.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে বিনিয়োগ, আমদানি ও রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও দেশটির অর্থনীতি আরও ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ মাহদি ঘোদসির মতে, যদি যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হয়, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়, তাহলে সেবা খাত, খুচরা ব্যবসা, নির্মাণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
তবে শিল্প খাতের চিত্র ভিন্ন। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এজন্য প্রয়োজন হবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও বিদেশি অর্থায়ন।
সাম্প্রতিক যুদ্ধে তেল-গ্যাস স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, ইস্পাত কারখানা, বন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক, সেতু এবং আবাসিক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। কিছু স্থাপনা চালু হলেও সার্বিক পুনর্গঠন এখনও অনেক দূরের লক্ষ্য।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত আবার শুরু হলে ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নতুন করে হামলা চালানো হতে পারে।
অন্যদিকে দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, জনগণের অসন্তোষ কমাতে না পারলে নতুন করে বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে। সরকারের একটি অংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পথ। তবে কট্টরপন্থীরা এখনও সেই অবস্থানের বিরোধিতা করছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য স্বস্তির সুযোগ তৈরি করলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সামনে দীর্ঘ ও কঠিন পথ অপেক্ষা করছে। স্থায়ী শান্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং নতুন বিনিয়োগ ছাড়া সেই পথ সহজ হবে না।