সংবাদ শিরোনাম

যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে বদলাচ্ছে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষের কৌশল

 প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে বদলাচ্ছে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষের কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সরাসরি সংঘাত আপাতত থেমেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ইরানের দীর্ঘদিনের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষ আগের মতো কার্যকর রয়েছে, নাকি সেটি নতুন রূপে আরও বিকেন্দ্রীভূত ও অভিযোজনক্ষম একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান তার দীর্ঘদিনের ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ বা অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা নীতির ওপর আগের মতো নির্ভর না করে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধ চলাকালে সীমিত ভূমিকা পালন করায় অনেকের ধারণা, তেহরান এখন সরাসরি নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাকেই প্রধান প্রতিরোধশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, প্রতিরোধ অক্ষ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধের সময় ইরান নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা ফরওয়ার্ড ডিফেন্স কৌশলের দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে।

অন্যদিকে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মরতাজাভি মনে করেন, এটি ব্যর্থতা নয়; বরং কৌশলগত অভিযোজন। তাঁর মতে, আঞ্চলিক মিত্রদের গুরুত্ব কমেনি, তবে ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন দেশটির প্রতিরোধ কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

তেহরানভিত্তিক ফিলিস্তিনি গবেষক ও সাংবাদিক আহমেদ আল-কমি বলেন, ইরানের মিত্রদের সীমিত অংশগ্রহণকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ বড় ধরনের আঘাতের মধ্যেও টিকে থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে এবং ইরান এখনো এই জোটকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে বিবেচনা করে।

যুদ্ধ শেষে পুনর্গঠন এখন ইরানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন তহবিল এবং স্থগিত সম্পদ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থ দেশীয় অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় হবে, নাকি মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করা হবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান প্রথমে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো পুনর্গঠনে গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখবে, কারণ এসব গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধ প্রতিরোধ অক্ষকে ধ্বংস করেনি; বরং এটিকে আরও বিকেন্দ্রীভূত ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্ক বড় সামরিক কাঠামোর বদলে সাইবার সক্ষমতা, গোয়েন্দা কার্যক্রম, নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে পারে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিরোধ কৌশল এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মিত্র গোষ্ঠীগুলো আগের মতো একক নির্দেশনায় পরিচালিত না হয়ে স্থানীয় বাস্তবতা ও নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলেও তারা ইরানের বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই থেকে যাবে। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতিরোধ অক্ষ দুর্বল না হয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরও নমনীয় ও অভিযোজনক্ষম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement