সংবাদ শিরোনাম

কে-পপকে টক্কর দিচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিজস্ব শিল্পীরা

 প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:২১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কে-পপকে টক্কর দিচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিজস্ব শিল্পীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগীতাঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে কে-পপ, পশ্চিমা পপ কিংবা জে-পপের আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন নিজ নিজ দেশের শিল্পীরাই শ্রোতাদের প্লেলিস্টে প্রধান স্থান দখল করছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপের বৈশ্বিক সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে সামনে এনে আন্তর্জাতিক মানের সংগীত তৈরি করছেন।

ফিলিপাইনের কল সেন্টারকর্মী জেসার বাজো জানান, কয়েক বছর আগেও তিনি মূলত পশ্চিমা সংগীত শুনতেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁর প্লেলিস্টের প্রায় ৭০ শতাংশই ফিলিপাইনের পি-পপ শিল্পীদের গান। তাঁর মতে, ২০২০ সালের পর দেশটির সংগীতশিল্পে ব্যাপক উত্থান ঘটেছে এবং স্থানীয় শিল্পীরা কে-পপের প্রশিক্ষণ ও উপস্থাপনার ধারা অনুসরণ করলেও নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ ফিলিপাইনের গার্ল গ্রুপ ‘বিনি’। চলতি বছরের এপ্রিলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত কোচেলা সংগীত উৎসবে পারফর্ম করা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফিলিপিনো গার্ল গ্রুপ হিসেবে ইতিহাস গড়ে। একইভাবে ‘আলামাত’ ও ‘বিজিও’-এর মতো দলগুলোও আন্তর্জাতিক মানের সংগীত পরিবেশন করলেও তাদের গানে স্থান পেয়েছে ফিলিপিনো ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা।

ফরাসি সংগীত বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সাউন্ডচার্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে স্পটিফাইয়ের সাপ্তাহিক শীর্ষ দশ গানের তালিকায় স্থানীয় শিল্পীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে রেডিও সম্প্রচারেও দেশীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই অঞ্চলে নিজস্ব সংগীতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

থাইল্যান্ডের চলচ্চিত্র প্রযোজক কোড সাত্রুসায়াং বলেন, দীর্ঘদিন ধরে থাই পপ সংগীত মূলত কোরিয়ান ও মার্কিন ধারা অনুসরণ করলেও গত কয়েক বছরে শিল্পীরা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে শুরু করেছেন। তাঁর মতে, কে-পপ দেখিয়ে দিয়েছে যে এশিয়ার সংগীতও বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পীরা এখন আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের লক্ষ্য করে নতুন ধরনের সংগীত তৈরি করছেন।

সংগীতশিল্পের এই বিকাশে টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিল্পীরা সরাসরি ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে নিজেদের গান ও পরিবেশনা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারছেন। ফিলিপাইনের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘বিজিও’-এর সদস্যদের ভাষ্য, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা এখন তাদের পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিও এই সাংস্কৃতিক উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার সংগীতশিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় ডিজিটাল সংগীত খাতের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এই প্রবণতায় ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। সিঙ্গাপুরে এখনো পশ্চিমা ও কে-পপের প্রভাব শক্তিশালী। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় স্থানীয় শিল্পীদের তুলনায় প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার শিল্পীরা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। গবেষকদের মতে, দুই দেশের ভাষা ও সাংস্কৃতিক মিলের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সংগীত সহজেই মালয়েশিয়ার শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কে-পপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পীদের জন্য একটি সফল মডেল তৈরি করেছে, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সেই মডেলকে অনুকরণে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুন ধারার সংগীত নির্মাণ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিজস্ব সংগীত এখন ক্রমেই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement