ইসরায়েলের দখল সম্প্রসারণে গাজা পশ্চিমতীরে নতুন উত্তেজনা তীব্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজা ও পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের দখল সম্প্রসারণের পদক্ষেপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। হেবরনের ঐতিহাসিক ইবরাহিমি মসজিদে স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের কাজ শুরু, গাজায় নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা এবং জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার অভিযোগ—এসব ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেবরনের ইবরাহিমি মসজিদের খোলা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি বাহিনী ভারী যন্ত্রপাতি এনে স্টিলের বিম স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি ঐতিহাসিক স্থাপনাটির মূল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের একটি পদক্ষেপ। একই সঙ্গে টানা প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে সেখানে মুসলিমদের আজান দেওয়াও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গাজাকে কেন্দ্র করেও ইসরায়েলের নীতিতে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ দাবি করেছেন, গাজার উত্তরাঞ্চলে তিনটি নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলোর অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিযান এগিয়ে চলছে।
এদিকে পশ্চিমতীরে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ, বসতি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন আউটপোস্টকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে অধিকৃত ভূখণ্ডে স্থায়ী দখল সুসংহত করার চেষ্টা চলছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুদের লক্ষ্য করে হত্যার ঘটনাগুলো গণহত্যার অভিপ্রায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে ইসরায়েল এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
একই সময়ে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি'তসেলেম জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ২৪১ জন ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোর নিহত হয়েছে। সংগঠনটির মতে, কার্যকর জবাবদিহির অভাব এবং বলপ্রয়োগের নীতির কারণেই এ ধরনের প্রাণহানি ঘটছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। পশ্চিমতীরের এল-বিরেহ এলাকায় অভিযানের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে গাজায় পৃথক হামলায় একাধিক শিশুসহ কয়েকজন বেসামরিক ফিলিস্তিনির প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি তাবুতে হামলায় এক নারী ও তার শিশু কন্যার মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা এখন প্রবেশ-নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে প্রায় অর্ধেক ডায়ালাইসিস মেশিন অচল হয়ে পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার অর্থায়ন চাহিদার এক-চতুর্থাংশেরও কম রয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভূমি দখলের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। যদিও একটি অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তবু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সামগ্রিকভাবে সহিংসতা ও ভূমি দখলের প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
সূত্র: আলজাজিরা