চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে
খুলনা ব্যুরো :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম থেকে উৎপন্ন মোট বর্জ্যের প্রায় ১৫ শতাংশই সংক্রামক, বিষাক্ত বা তেজস্ক্রিয়—যা জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি। প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ইনজেকশন ব্যবহৃত হলেও অধিকাংশ দেশে এসব সিরিঞ্জ ও সুচের নিরাপদ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা যায় না। ফলে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ও এইচআইভি/এইডসসহ নানা রক্তবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্জ্যের সঠিক বিভাজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতাই ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। এমনকি ২০২৫ সালের এক গবেষণায় সংক্রামক ও অ-সংক্রামক বর্জ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা করতে মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তির ব্যবহার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ব্র্যাকের ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে উৎপন্ন চিকিৎসা বর্জ্যের মাত্র ৬.৬ শতাংশ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিদিন গড়ে ২৪৮ টন বর্জ্য হাসপাতালগুলো থেকে উৎপন্ন হলেও মাত্র ১৪.১ শতাংশ নিয়ম মেনে নিষ্কাশন করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ হাসপাতালে বর্জ্য আলাদা করার জন্য রঙ-কোডেড পাত্র নেই এবং ৮৩ শতাংশেরই নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেই। প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, বিভিন্ন হাসপাতাল ও বর্জ্য সংগ্রহকারী একটি চক্র গঠন করে জীবাণুমুক্ত না করেই বিপজ্জনক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করছে। এমনকি ২০২৩ সালের এক রিপোর্টে বর্জ্য সংগ্রাহকদের রক্তে হেপাটাইটিস-বি শনাক্তের ঘটনাও পাওয়া যায়।
অব্যবস্থাপনার কারণে শার্পস বা জৈব-ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য সরাসরি সংক্রামক রোগ ছড়ানোর প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। রাসায়নিক বর্জ্য ও ওষুধের অবশিষ্টাংশ মাটি ও পানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বর্জ্য সংগ্রাহক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আশপাশের সাধারণ মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। তাদের সুপারিশ—বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রয়োগ, বর্জ্য উৎসে রঙ-চিহ্নিত পাত্রে শ্রেণিবিন্যাস বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক ইনসিনারেটর ও অটোক্লেভ স্থাপন, জাতীয় ডাটাবেসে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং অবৈধ বর্জ্য বাণিজ্য ঠেকাতে মিডিয়া ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় করা। পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় বর্জ্য শ্রেণিবিন্যাস প্রযুক্তি গ্রহণের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, রোগ নিরাময়ের পথে তৈরি হওয়া চিকিৎসা বর্জ্যই যখন জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদে পরিণত হয়, তখন পরিস্থিতিকে আর হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে।