সংবাদ শিরোনাম

সরকার বদলায়, দুর্নীতি নয়

 প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:১৪ অপরাহ্ন   |   জেলার খবর

রতন প্রধান: 

বাংলাদেশে সরকার আসে, সরকার যায়—এটাই গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। কিন্তু বছরের পর বছর একটি বিষয় প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—প্রশাসনিক দুর্নীতি। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে নির্বাচন, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে; অথচ দুর্নীতির বিদায় ঘটে না। অনেকের কাছে এটি যেন রাষ্ট্রের ভেতরে প্রোথিত এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি, যার শুরু কবে তা যেমন স্পষ্ট নয়, শেষও তেমনি অনিশ্চিত।

ভূমি অফিস, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প- প্রশাসনের প্রায় সব স্তরেই ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সরকার পরিবর্তনের পরপরই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, শুদ্ধি অভিযান কিংবা ‘জিরো টলারেন্স’ এর ঘোষণা আসে। কিছুদিন আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি মূলত কাঠামোগত। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নজরদারি এবং দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এক সরকার বিদায় নিলেও প্রশাসনের বড় একটি অংশ অপরিবর্তিত থেকে যায়। ফলে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে দুর্নীতি কমে না।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। জন্মনিবন্ধন, ভূমি সংক্রান্ত সেবা, চিকিৎসা কিংবা মামলা পরিচালনায় ন্যায্য অধিকার পেতে অনেককে দিতে হয়  অঘোষিত খরচ। এতে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয় আরও গভীর হয়।

দুর্নীতিবিরোধী কমিশনসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না, এমন মত বিশেষজ্ঞদের।


সুশাসনের পথে অগ্রসর হতে হলে সরকার পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় বাস্তবায়ন ছাড়া দুর্নীতির এই দীর্ঘচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

সরকার আসবে, সরকার যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্নীতি যদি থেকেই যায়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়বে। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই চক্র ভাঙার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার ওপর। প্রশ্ন একটাই—সে উদ্যোগ কবে এবং কতটা আন্তরিকভাবে নেওয়া হবে?