ঠাকুরগাঁওয়ে দুই বছরের মধ্যে উড়বে উড়োজাহাজ, ধর্মের নামে রাজনীতি এ দেশে চলবে না: মির্জা ফখরুল
প্রতিবেদক, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও:
সুদীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি অবশেষে নতুন প্রাণ পেতে যাচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই বিমানবন্দর থেকে পুনরায় উড়োজাহাজ চলাচলের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেছেন, এ দেশের মানুষ ধর্মের নামে রাজনীতি করা কোনো দলকে কখনোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসাবে না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, গণমানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের এ দেশের সচেতন নাগরিকেরা চিরতরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জে অবস্থিত পরিত্যক্ত বিমানবন্দর চত্বরে জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল ও রাজকীয় গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘদিন পর নিজ এলাকায় মন্ত্রীর আগমন এবং বিমানবন্দর চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলাজুড়ে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ব্যানার, ফেস্টুন আর তোরণে সেজে ওঠে চারপাশ। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পর এলজিআরডি মন্ত্রীকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং পুষ্পবৃষ্টির মাধ্যমে বর্ণিল অভ্যর্থনা জানানো হয়। লাল গালিচা বিছানো এই রাজকীয় সংবর্ধনায় উপস্থিত লাখো জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হন মন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, একটি দল ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে; সেই দলটির নাম আপনারা জানেন তো? এ সময় উপস্থিত জনতা সমস্বরে চিৎকার করে ‘জামায়াতে ইসলামী’ বলে উঠলে মন্ত্রী জনতার উল্লাসের মধ্যে বলেন, এই নামটা আরও জোরে বলতে হবে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, মিথ্যা আশ্বাস ও ধর্মের অপব্যবহার করে এ দেশে আর কোনো রাজনীতি চলবে না। রাজনীতি হতে হবে সত্য, আদর্শ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি একাত্তরের পৈশাচিকতার স্মৃতি চারণ করে বলেন, এই জামায়াতে ইসলামী মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছিল। তারা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, এ দেশের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যকে দেশের মানুষ ভুলে যায়নি এবং যাবেও না। ফলে জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিত এই দলটির এ দেশে ক্ষমতায় আসার কোনো সুযোগ নেই।
জনসভার মূল আকর্ষণ ছিল ঠাকুরগাঁও পরিত্যক্ত বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার ঘোষণা। এলজিআরডি মন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পরপরই বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে সঙ্গে নিয়ে পুরো বিমানবন্দর এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। দীর্ঘ তিন দশক ধরে বন্ধ থাকা এই রানওয়ে ও অবকাঠামো খতিয়ে দেখে মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের এই বন্ধ বিমানবন্দর দুটি চালুকরণের বিষয়টি ইতিমধ্যে সরকারের পরিকল্পনা বিভাগের অগ্রাধিকার তালিকা বা 'সবুজ পাতায়' আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বা সার্ভে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু হবে। সব প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া ঠিকঠাক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই রানওয়ে থেকে পুনরায় ডানা মেলবে উড়োজাহাজ। বিমানবন্দরটি চালু হলে কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থারই আমূল পরিবর্তন হবে না, বরং এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
তিন মন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যেও ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল গণসংবর্ধনা সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও নবগঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর ইসরাফিল শাহীন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডাক্তার আব্দুস সালাম, জাহিদুর রহমান এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও-র নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ্জামান।
বক্তারা সকলেই ঠাকুরগাঁওয়ের এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন যাত্রার প্রশংসা করেন এবং নবগঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগকে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে অভিহিত করেন। সমাবেশে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং দলের বিভিন্ন স্তরের হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে সফল করে তোলেন। শেষ বিকেলে মন্ত্রীদের বিদায় জানানোর সময়ও জনমনে এক নতুন আশার আলো ও উদ্দীপনা বিরাজ করছিল।