পশুর হাটে মহিষের তাণ্ডব: দেওয়ানগঞ্জে দুই ক্রেতার করুণ মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া
জামালপুর প্রতিবেদক:
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমে উঠতে শুরু করেছিল জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের ঐতিহাসিক সানন্দবাড়ী পশুর হাট। চারদিকে ছিল ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহল আর দরদামের চেনা ব্যস্ততা। কিন্তু মুহূর্তের একটি আকস্মিক ঘটনা সেই আনন্দমুখর উৎসবের আমেজকে রূপ দিল এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডিতে। হাটে বিক্রির জন্য আনা একটি উন্মত্ত মহিষের আকস্মিক আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন দুই জন সাধারণ মানুষ, আহত হয়েছেন আরও অন্তত পাঁচজন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় এখন নেমে এসেছে গভীর শোক ও আতঙ্ক।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রবিবার (২৪ মে)। স্থানীয় আকন্দপাড়া গ্রামের এক খামারি বিক্রির উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি বড় আকারের মহিষ নিয়ে সানন্দবাড়ী হাটে আসেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই একটি মহিষ অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। চোখের পলকে দড়ি ছিঁড়ে মহিষটি মালিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তীব্র গতিতে হাটজুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে। আকস্মিক এই ঘটনায় হাটে আসা শত শত মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আত্মরক্ষার্থে মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করলে হাটের মধ্যে এক বিশৃঙ্খল ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উন্মত্ত মহিষটি তার সামনে পড়া লোকজনকে একের পর এক শিং দিয়ে আঘাত ও পদপিষ্ট করতে থাকে।
মহিষের এই তাণ্ডবের মুখে পড়ে ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার জাউনিয়ার কড়াইডাঙ্গীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন। রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা করালেও শেষ রক্ষা হয়নি; অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে পথেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন সানন্দবাড়ী এলাকার চর মাদার গ্রামের মৃত নূর মোহাম্মদের ছেলে মজিবুর রহমান। তাকে প্রথমে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সোমবার (২৫ মে) রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সানন্দবাড়ী হাটসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোরবানির হাটের মতো একটি জনাকীর্ণ স্থানে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে পশুর হাটের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানামুখী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, হাটে বিশাল আকৃতির ও বন্য প্রকৃতির পশুপাখি আনা হলেও সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার বা কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইজারাদার কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছিল না।
এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মহিষের আক্রমণে আহত মজিবুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ায় এই ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই জনে। নিহতদের মরদেহের আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এই অনভিপ্রেত ঘটনাটি খামারি বা বিক্রেতার অসচেতনতার কারণে ঘটেছে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, তবে অভিযোগ পেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে। ঈদের আগে এমন আকস্মিক ও বেদনাদায়ক মৃত্যুতে নিহতদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম।