২০২৮ সালে আসছে নতুন প্রাথমিক পাঠ্যক্রম: ‘শিখতে না পারলে সব চেষ্টাই ব্যর্থ
প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের আমূল পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রচলিত পরীক্ষা-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা ও শিখনফল নিশ্চিত করতে আগামী ২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক স্তরে সম্পূর্ণ নতুন একটি পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম চালু করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন এই রূপরেখায় শিক্ষার্থীদের কতটুকু তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া হলো, তার চেয়েও বেশি জোর দেওয়া হবে তারা বাস্তব জীবনে কতটুকু শিখতে পারছে এবং তা প্রয়োগ করতে পারছে কি না—তার ওপর। মূলত শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী এবং আনন্দময় করে তোলার লক্ষ্যেই সরকারের এই মেগা পরিকল্পনা।
রোববার (১৭ মে) দুপুরে ময়মনসিংহে অবস্থিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (ন্যাপ) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এই নতুন রোডম্যাপের কথা ঘোষণা করেন। ‘প্রাথমিক স্তরের বাংলা ভাষার দক্ষতা উন্নয়ন পাইলটিং কার্যক্রমের বেইজলাইন রিপোর্ট শেয়ারিং’ শীর্ষক এই সভায় দেশের বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষার হালচাল, দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু রূঢ় বাস্তবতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো বেশ কিছু জায়গায় পিছিয়ে রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। অনেক শিক্ষার্থী ফেল করছে কিংবা ঝরে পড়ছে, যার মূল কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো শিক্ষার্থীদের সহজে শেখানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আমরা মূল শিখন প্রক্রিয়া থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর কারিকুলাম নকশা করা। কারণ কারিকুলাম যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে বাকি যত অবকাঠামোই উন্নয়ন করা হোক না কেন, তার কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। ভুল কারিকুলাম নিয়ে কখনো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করে ববি হাজ্জাজ জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন এই পাঠ্যক্রমের চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন করা হবে। এরপরের এক বছর সময় নেওয়া হবে এই নকশাটি মাঠপর্যায়ে পাইলটিং বা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করার জন্য। পাইলটিংয়ের যাবতীয় ফলাফল এবং ফিডব্যাক মূল্যায়ন করে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে দেশব্যাপী প্রাথমিকের নতুন পাঠ্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে। আর ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই নতুন পাঠ্যক্রমের ওপর নিবিড় ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হবে, যাতে তারা নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন।
শিক্ষার এই রূপান্তর কেবল পাঠ্যবই বা কারিকুলামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন কারিকুলামের ওপর ভিত্তি করে যেমন নতুন টেক্সটবুক বা পাঠ্যপুস্তক তৈরি হবে, ঠিক তেমনি দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং ভেতরের পরিবেশও পুনর্বিন্যাস করা হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে সাজানো হবে, যেন বিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণ এবং চারপাশের পরিবেশ শিশুদের খেলাধুলার ছলে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিখতে উদ্বুদ্ধ করে।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (ন্যাপ) মহাপরিচালক ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সভায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবব্রত চক্রবর্তী। এ সময় ন্যাপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে পাইলটিং কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। উপস্থিত বক্তারা প্রতিমন্ত্রীর এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, একটি দক্ষ ও স্মার্ট প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার কোনো বিকল্প নেই এবং ২০২৮ সালের এই নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।