মমেক হাসপাতালে হামের থাবা: নিভে যাচ্ছে শৈশবের প্রদীপ, করিডোরে দীর্ঘ হচ্ছে স্বজনদের আহাজারি

 প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন   |   ময়মনসিংহ

মমেক হাসপাতালে হামের থাবা: নিভে যাচ্ছে শৈশবের প্রদীপ, করিডোরে দীর্ঘ হচ্ছে স্বজনদের আহাজারি

​নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

​ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেয়ালগুলো যেন আজ এক একটি শোকগাথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় ভেসে আসছে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়া মা-বাবার আর্তনাদ। যেখানে শিশুদের খিলখিল হাসিতে ঘর মুখরিত থাকার কথা, সেখানে সাদা চাদরে ঢাকা পড়ছে নিথর দেহ। মমেক হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসের মিছিল। পাঁচ মাসের ছোট্ট আরিয়া মণি ছিল হুমায়ুন-লিজা দম্পতির বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। গত সোমবার যখন তাকে হাসপাতালে আনা হয়, তখনো মা-বাবার চোখে ছিল বুকভরা আশা। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেলের ম্লান আলোয় সেই আশা চিরতরে মিলিয়ে গেল। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে আছড়ে পড়ছিলেন মা লিজা, আর সেই দৃশ্য দেখে উপস্থিত অন্য অভিভাবকদের চোখেও নেমে আসছিল আতঙ্ক ও সমবেদনার অশ্রু।

​হাসপাতালের চিত্রটি এখন বড়ই করুণ। তিল ধারণের ঠাঁই নেই আইসোলেশন ওয়ার্ডে। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ দ্বিগুণ হওয়ায় হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে মেঝে আর সংকীর্ণ বারান্দাই এখন শত শত শিশুর আশ্রয়স্থল। ফুলবাড়িয়ার মারাবিয়া খাতুন তাঁর ছয় মাসের সন্তান রাব্বিকে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছেন। ১০৩ ডিগ্রি জ্বর আর তীব্র শ্বাসকষ্টে শিশুটির ছোট শরীরটা নীল হয়ে আসছে, কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি একটি শয্যা। পাশেই ঈশ্বরগঞ্জের ইয়ামিনের মা আকলিমা আক্তারের চোখে ক্ষোভ আর জল। বড় সন্তানকে বাড়িতে রেখে আসার জায়গা নেই বলে হামে আক্রান্ত ছোট ভাইয়ের পাশেই শুইয়ে রাখতে হচ্ছে তাকে। সংক্রমণের এমন ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়েও অসহায় বাবা-মা যেন নিয়তির হাতেই সব ছেড়ে দিয়েছেন।

​চলতি বছরে এই হাসপাতালে হামের করাল গ্রাসে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩০টি নিষ্পাপ শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু হাম নয়, এর সাথে যুক্ত হওয়া নিউমোনিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গত সোমবার মুক্তাগাছার সাত মাসের এক শিশু জীবনযুদ্ধে হেরে যায় কেবল এই দ্বিমুখী সংক্রমণের কারণে। একদিকে সরকারি ওষুধের ঘাটতি, অন্যদিকে দিনের পর দিন হাসপাতালে পড়ে থেকে নিঃস্ব হওয়া অভিভাবকদের শূন্য পকেট—সব মিলিয়ে এক চরম অব্যবস্থাপনার ছবি ফুটে উঠছে এখানে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেখা মিলছে না সময়মতো, আর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর ভরসা করেই কাটছে উৎকণ্ঠার রাত।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে টিকাদানে অনীহা বা অসচেতনতা। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, বর্তমানের ৯৬ জন রোগীর বিপরীতে শয্যা আছে মাত্র ৬৪টি। গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাজারেরও বেশি শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশের সাথে জ্বর দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না। তবে কেবল সচেতনতা কি এই পরিস্থিতির সমাধান? যেখানে হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে থাকা এক শিশুর শরীর থেকে অন্য শিশুর শরীরে রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা প্রবল, সেখানে প্রশাসনের আরও জোরালো পদক্ষেপ আর পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ এখন সময়ের দাবি। ময়মনসিংহের এই বিষণ্ণ করিডোরে আর কোনো আরিয়া মণি যেন অকালে ঝরে না পড়ে, সেই প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে আতঙ্কিত জনপদ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement