কীর্তনখোলার তীরে রঙের উৎসব: আলপনা আর আলোর ছটায় মুগ্ধ বরিশালবাসী
প্রতিবেদক,বরিশাল:
প্রতিদিনের চেনা, জ্যামে ঠাসা যে ধূসর রাস্তা দিয়ে মানুষ ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যায়, সেই চেনা পথগুলোই যেন হঠাৎ এক রাতের ব্যবধানে রূপ নিয়েছে এক একটি জীবন্ত ক্যানভাসে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এক অভূতপূর্ব ও নতুন রূপে সেজেছে কীর্তনখোলা তীরের ঐতিহ্যবাহী শহর বরিশাল। ইটের পর ইট আর কংক্রিটের ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক নগরীকে ঈদের অনাবিল আনন্দ দিতে বরিশাল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি রাজপথে আঁকা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আলপনা। নাগরিক জীবনের চরম ব্যস্ততা আর যান্ত্রিকতার মাঝে রঙের এই মায়াবী ছোঁয়া পুরো উৎসবের আমেজকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ, যা ঈদের ছুটিতে ঘরে ফেরা ও ঘুরতে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে এনে দিয়েছে এক পরম স্বস্তি।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) উদ্যোগে ঈদের এই বিশেষ ও নান্দনিক আয়োজন করা হয়েছে, যা আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় লোকজ সংস্কৃতির এক দারুণ মেলবন্ধন। বিসিসি-র প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ এই উদ্যোগের পেছনের গল্প তুলে ধরে জানান, ঈদ উপলক্ষে নগরবাসীর বিনোদনের জন্য প্রথমেই সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের চৌমাথা লেকে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক মিউজিক্যাল ফোয়ারা বসানো হয়েছে। পানির ছন্দে রঙিন আলোর খেলা ইতিমধ্যেই বিনোদনপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি উৎসবের আনন্দকে আরও উপভোগ্য করতে শহরের প্রাণকেন্দ্র বটতলা, ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুল মোড়, রাজাবাহাদুর সড়ক ও বরিশাল ক্লাবের সামনেসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের রাজপথ আলপনার রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ কেবল উৎসবের রঙই ছড়ায়নি, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছে।
এই বর্ণিল রূপান্তরের নেপথ্যে রয়েছে একদল তরুণ প্রাণের অক্লান্ত পরিশ্রম। গভীর রাতে যখন পুরো নগরী গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণ-তরুণী তুলির টানে রাজপথকে সাজানোর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে মেতে ওঠেন। চারুকলার তরুণ শিল্পী দুর্জয় সিংহ জানান, সিটি করপোরেশনের এমন দারুণ উদ্যোগে শামিল হতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত। পুরো কাজ শেষ করতে তাঁদের প্রায় দুই রাতের মতো সময় লেগেছে। শিল্পীদের সেই বিনিদ্র রজনীর গভীর মনোযোগ আর রঙের খেলা ভোরের আলো ফুটতেই নগরবাসীর চোখে এনে দিয়েছে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। এই তরুণেরা প্রমাণ করেছেন যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও শৈল্পিক মনন দিয়ে একটি চেনা শহরকেও কতটা মোহনীয় করে তোলা সম্ভব।
ঈদের দিন পরিবার নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে শহরের এই নতুন রূপ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন নগরীর বিভিন্ন স্তরের মানুষ। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা তৃষা রহমান তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বললেন, ঈদের দিন স্বামী ও সন্তানদের সাথে নিয়ে বেলস পার্ক যাওয়ার সময় এই বিশাল আলপনা দেখে গাড়ি থামিয়ে উপভোগ করেছেন। তাঁর মতে, পুরো নগরীটাকে দেখতে অত্যন্ত চমৎকার ও সুন্দর লাগছে, যা শিশুদের মনেও এক ভিন্নরকম আনন্দের সৃষ্টি করেছে। শহরের এই শৈল্পিক রূপান্তর নিয়ে বিশিষ্ট কলেজ শিক্ষক ও কবি মিলন মহাজন তাঁর ভাবনা প্রকাশ করতে গিয়ে জানালেন, যান্ত্রিক এই শহরের বুকে আলপনা আমাদের জানান দেয় আমাদের শিকড় ও সংস্কৃতির কথা। এটি কেবল রঙ-তুলির সাধারণ টান নয়, বরং আমাদের হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের এক পরম প্রকাশ। একই সুর শোনা গেল সংগীতশিল্পী আবু হেনার কণ্ঠেও। তাঁর ভাষ্যমতে, গভীর রাতে একদল তরুণ-তরুণী যখন ঘুমন্ত শহরকে আলপনা এঁকে বরণ করে নেয়, তখন নতুন ভোরে পথচলতি ক্লান্ত নাগরিকের চোখেও এটি এক অদ্ভুত স্বস্তি আর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলে।
সিটি করপোরেশনের এই নান্দনিক উৎসব আয়োজন কেবল আলপনা কিংবা ফোয়ারাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক নগরীর সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে আরও কিছু যুগোপযোগী পদক্ষেপ। বিসিসি-র প্রেস সচিব সাকলাইন মোস্তাক জানান, শুধু আলপনাই নয়, ঈদ উপলক্ষে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চোখধাঁধানো ও আধুনিক আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজাবাহাদুর সড়কে রঙিন আলোর ছটা রাতের বরিশালকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ভিড় করছেন। তা ছাড়া পুরো নগরীজুড়ে ফুটপাতের বর্ডারে কোথাও লাল-সাদা, কোথাও কালো-সাদা আবার কোথাও হলুদ-সাদা রঙ করে সুশৃঙ্খল রূপ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি পথচারীদের পারাপারের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে দৃষ্টিনন্দন জেব্রা ক্রসিংও আঁকা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের এমন নান্দনিক, ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগের কারণে এবারের ঈদ বাণিজ্যিক এই নগরীর মানুষের কাছে কেবল একটি উৎসবই নয়, বরং এক রঙিন ও অবিস্মরণীয় স্মৃতির স্মারক হয়ে উঠেছে।