পাবনায় জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে এমপির থানা ঘেরাও
ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি:
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের কালিনজিরা ব্রিজের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত ওই নেতার নাম জিল্লুর রহমান, যিনি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য এবং স্থানীয় দাসমরিচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি ওই গ্রামের নজির উদ্দিনের ছেলে। বর্তমানে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে থানা ভবনের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে খানমরিচ ইউনিয়ন এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে জামায়াত নেতা জিল্লুর রহমানের একটি বিষয় নিয়ে তীব্র কথা-কাটাকাটি হয়। তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জিল্লুর রহমান ওই কর্মীদের মধ্যে একজনকে থাপ্পড় মারেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে জিল্লুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত কাজ শেষে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি কালিনজিরা ব্রিজের ওপর পৌঁছামাত্রই পূর্ব ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র যুবক তাঁর গতিপথ রোধ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। বুক, পিঠ ও মাথায় উপুর্যপরি আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে ব্রিজের ওপর রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় তাঁকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা চিৎকার শুরু করেন। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁর ক্ষতবিক্ষত শরীরের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মাথার আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁর অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হতে থাকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর বা রেফার করেন। বর্তমানে সেখানে আইসিইউর চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাঁর চিকিৎসা চলছে এবং তাঁর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
এদিকে জামায়াত নেতার ওপর এই নৃশংস হামলার খবর ভাঙ্গুড়া উপজেলা সদর ও রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে রাত ১০টার দিকে পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আলী আছগার ক্ষুব্ধ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে ভাঙ্গুড়া থানা ভবনের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা থানা চত্বরে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে উত্তাল করে তোলেন থানা এলাকা। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সংসদ সদস্য মাওলানা আলী আছগার প্রশাসনের উদ্দেশে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালাচ্ছে, যা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বা আলটিমেটাম বেঁধে দেন। এই সময়ের মধ্যে মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা না হলে আগামীতে রাজপথ অবরোধসহ আরও কঠোর ও জোরালো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজম হামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশের একাধিক টিম অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং আসামিরা যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি দাবি করেন, এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।