ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন যুদ্ধের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মখা দখলের মধ্য দিয়ে ইরান-সমর্থিত হুতিদের অগ্রযাত্রা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত ইয়েমেনে আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ১০০-এর বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সরাসরি হামলা চালাতে রাজি হননি। তবে হুতিদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সৌদি আরবকে সামরিক তথ্য ও সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর মধ্যেই শুক্রবার সৌদি আরব জানায়, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে দেশটি নিশ্চিত করে, ইরাক থেকে ছোড়া ‘বেশ কয়েকটি’ ড্রোনের হামলায় পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরব প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করতে পারে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোহিত সাগরের মাধ্যমে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে পাইপলাইনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এর মধ্যে মখা দখল সৌদি আরবের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরনগরী বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। ওই প্রণালির নিয়ন্ত্রণে মখার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে।
একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা বাব আল-মান্দেবের মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপও দখল করেছে। আগস্টে মখায় আবার হামলা শুরু করার পর বৃহস্পতিবার শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। ২০২২ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি হওয়ার পর এটিই হুতিদের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড দখল বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; কয়েকটি হামলাই এই নৌপথকে বিমা কোম্পানি ও বড় জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। এতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজর্সের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ব্রেট এরিকসন বলেছেন, হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য পরিস্থিতি ‘চেকমেট’-এর মতো হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করা গেলেও অতিরিক্ত সময়ের কারণে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক আহমাদ শারাওয়ির মতে, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে সৌদি আরব। কারণ হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে দেশটি লোহিত সাগরের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
সৌদি আরব হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিমান হামলা চালাতে পারে। তবে শুধু বিমান শক্তি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে শারাওয়ি মনে করেন। তাঁর মতে, দখল করা এলাকা পুনরুদ্ধারে স্থলবাহিনীরও প্রয়োজন হবে।
এদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্তির কারণে তাদের সামরিক অগ্রগতি সীমিত এবং স্থল অভিযান পরিচালনাও জটিল হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার ইয়েমেনের সরকারি মুখপাত্র জানান, মখার কাছে হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের বিমানবাহিনী।
হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শুক্রবার দাবি করেছেন, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এর আগে আগস্টের শুরুতে ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলীয় মারিব শহরে সৌদি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। ওই হামলায় দুজন নিহত এবং ১০ জনের বেশি আহত হন।
শুক্রবারের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের দুটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। আল মেসবাহ এলাকার একটি স্টেশনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং আল ধেকরার কাছে আরেকটি স্টেশন থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, পাইপলাইনটি মেরামত করা সৌদি আরবের পক্ষে সম্ভব হলেও একের পর এক হামলার আশঙ্কাই বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ একই সময়ে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালির সংকট এবং বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহে ব্যাঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও নাজুক করে তুলছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা মে মাসের মাঝামাঝির পর প্রথমবার।
সাবেক পেন্টাগন উপ-প্রেসসচিব সাবরিনা সিং বলেছেন, ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হবে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।