সংবাদ শিরোনাম

বাল্যবিবাহ সংকট বাড়ায়, সমাধান নয়: মাহ্দী আমিন

 প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৮ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

বাল্যবিবাহ সংকট বাড়ায়, সমাধান নয়: মাহ্দী আমিন

মহানগর ডেস্ক:

বাল্যবিবাহ কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি একটি মেয়ের শিক্ষা, স্বপ্ন ও আত্মনির্ভরশীলতার পথে বড় বাধা তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকটের জন্ম দেয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

সোমবার সকালে ঢাকার একটি হোটেলে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ প্রতিরোধ এবং মেয়েশিশুর অধিকার রক্ষায় সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চাইল্ড, নট ব্রাইড’ ক্যাম্পেইনের যাত্রা শুরু হয়।

মাহ্দী আমিন বলেন, অনেক পরিবার মনে করে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেই হয়তো একটি সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে বাল্যবিবাহের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং আরও বড় সংকট তৈরি হয়। দারিদ্র্য বা পারিবারিক চাপ কোনোভাবেই শিশুর শৈশব ও শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ হতে পারে না।

তিনি বলেন, কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যথাযথ শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিয়ে একজন মেয়েকে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে সে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে নারীদের অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশা ও দায়িত্বে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও উন্নয়ন খাতে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলও মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতির একটি চিত্র তুলে ধরে।

তিনি বলেন, সরকার এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি সমান সুযোগ পাবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করবে।

নারী শিক্ষার প্রসারে অতীতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র নারী মন্ত্রণালয় গঠন এবং তৈরি পোশাক খাতে নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের পথও সে সময় আরও বিস্তৃত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায়ই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তিন নারী—মা, স্ত্রী ও কন্যার কথা গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলেও জানান তিনি।

বাল্যবিবাহ বন্ধে শুধু আইন করলেই হবে না, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রমও জরুরি বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন। তাঁর মতে, সামাজিকভাবে বাল্যবিবাহকে স্বাভাবিক বা ‘শুভ কাজ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে। এ জন্য গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

দারিদ্র্যের কারণে যাতে কোনো শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মিড-ডে মিল, স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ দেওয়ার কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। এসএসসি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল করতে না পারা শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মমুখী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাল্যবিবাহের পেছনে থাকা কারণগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দরিদ্র পরিবারের আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ এবং মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া—এসব কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নীতি ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

জাল কাগজপত্র তৈরি করে মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে বয়সে একটি শিশুর হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তার ভবিষ্যতের প্রতি চরম অবিচার।

তিনি আরও বলেন, শৈশব প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। কোনো অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক চাপ কিংবা প্রচলিত মানসিকতার কারণে যেন একটি মেয়ের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাল্যবিবাহের কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেন, বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম) নীলিমা ইয়াসমিনসহ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, সাংবাদিক ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নির্মিত গান, ভিডিও ও পাবলিক সার্ভিস অ্যানাউন্সমেন্ট প্রদর্শন করা হয়।