মিয়ামিতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচজনই দুই গাড়ির আরোহী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ে ছাড়িয়ে দুটি গাড়িতে আঘাত করে অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত পাঁচজনই ওই দুই গাড়ির আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনায় অন্তত আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
সোমবার দুর্ঘটনার তদন্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) চেয়ার জেনিফার হোমেন্ডি। তিনি জানান, তদন্তকারীরা বিমানটির ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার-দুটিই উদ্ধার করেছেন।
অ্যামাজন এয়ারের ফ্লাইট ৭৫৯৮ ছিল বোয়িং ৭৬৭-৩৩এ। বিমানটি পরিচালনা করছিল ২১ এয়ার এলএলসি। পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ান থেকে মিয়ামিতে ফেরার সময় বিমানটি রানওয়ে ৩০-এ অবতরণের পর নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়।
হোমেন্ডি জানান, রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বিমানটি প্রথমে নেভিগেশন সরঞ্জামে আঘাত করে। এরপর বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা প্রফেশনাল ওশান সার্ভিস করপোরেশনের মালিকানাধীন ২০১২ সালের একটি সাদা ফোর্ড ইকোনোলাইন ভ্যানে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার সময় ভ্যানটিতে সাতজন ছিলেন।
এরপর বিমানটি বিমানবন্দরের সীমানার বেড়া ভেঙে নর্থওয়েস্ট ৬৭ অ্যাভিনিউয়ে চলাচলরত একটি টয়োটা করোলা ক্রস এল গাড়িতে আঘাত করে। সেখান থেকে বিমানটি ঘাসের ওপর দিয়ে আরও এগিয়ে গিয়ে আরেকটি বেড়ায় আঘাত করে এবং টেসলার রোবোট্যাক্সি রাখা একটি এলাকায় গিয়ে থামে।
হোমেন্ডির হিসাবে, রানওয়ের পাকা অংশ শেষ হওয়ার পরও বিমানটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ ফুট এগিয়ে যায়। নিহত পাঁচজনই ওই দুটি গাড়ির মধ্যে ছিলেন। ফোর্ড ভ্যানটি বিমানবন্দরের ভেতরে এবং টয়োটা গাড়িটি বিমানবন্দরের বাইরে ছিল।
আহতদের মধ্যে দুজনকে জ্যাকসন মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থা জানা যায়নি। আরও তিনজনকে জ্যাকসনের রাইডার ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়েছে; তাঁদের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছে মিয়ামি-ডেড শেরিফের কার্যালয়।
দুর্ঘটনার পর ধারণ করা একটি মুঠোফোনের ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা দুমড়েমুচড়ে যাওয়া টয়োটা গাড়ির ভেতর থেকে একজন জীবিত ব্যক্তিকে বের করার চেষ্টা করছেন।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর চারদিকে কালো ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কাছাকাছি কর্মরত আব্রাহাম আলতামার বলেন, দুর্ঘটনার পর তিনি এক ব্যক্তিকে দেখেছেন, যাকে তাঁর পাইলট বলে মনে হয়েছে। তাঁর কপাল ও হাতে সামান্য আঘাত ছিল এবং তিনি দৃশ্যতই ভীত ছিলেন।
আলতামারের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি ফোনে তাঁর স্ত্রীকে জানান, তিনি ঠিক আছেন এবং দুর্ঘটনার পর বিমান থেকে বের হয়ে এসেছেন।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করায় স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও শেরিফের কার্যালয়ের প্রশংসা করেছেন কর্মকর্তারা। মিয়ামি-ডেড কাউন্টির কমিশনার ন্যাটালি মিলান অরবিস বলেন, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
এদিকে দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটির দুটি রেকর্ডারই এনটিএসবি সদর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। সেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে। তদন্তকারীদের কাছে অন্য উৎস থেকে বিমানের গতির কিছু তথ্য রয়েছে, তবে প্রকাশের আগে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের তথ্য দিয়ে তা যাচাই করতে চান তাঁরা।
এনটিএসবি জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে তাদের ৩২ জন সদস্য কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযান ও বিমান থেকে জ্বালানি অপসারণ চলায় তদন্তকারীরা এখনো পুরো বিমানটি পরীক্ষা করতে পারেননি। এখনো কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি।
তদন্তের পরবর্তী ধাপে মানবিক কর্মদক্ষতা, বিমানের বিভিন্ন ব্যবস্থা, ইঞ্জিন, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, বিমানের পারফরম্যান্স, কাঠামো, আবহাওয়া এবং বিমানবন্দরের জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে আলাদা দল কাজ করবে।
রানওয়ের শেষ প্রান্তে ইঞ্জিনিয়ারড ম্যাটেরিয়ালস অ্যারেস্টিং সিস্টেম বা ইএমএএস থাকা উচিত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখবে এনটিএসবি। ইএমএএস হলো রানওয়ের শেষে ব্যবহৃত বিশেষ হালকা ও চাপলে ভেঙে যায় এমন উপাদান, যা রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়া বিমানকে নিরাপদে থামাতে সাহায্য করে। তবে প্রতিটি বিমানবন্দরে এ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
অ্যামাজন ও ২১ এয়ারের মধ্যে চুক্তিগত সম্পর্কও তদন্তের আওতায় আসছে। হোমেন্ডি বলেন, কার্গো পরিবহনটি অ্যামাজনের জন্য হলেও বিমান পরিচালনার দায়িত্ব ছিল ২১ এয়ারের। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত ও নীতিমালা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি ১৯৯৪ সালে তৈরি। এর বয়স এবং মালিকানা পরিবর্তনের ইতিহাসও তদন্ত করা হবে।
ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণ করবে না এনটিএসবি। এই পর্যায়ে সংস্থাটির লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনাস্থল নথিবদ্ধ করা এবং নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা। তদন্তকারীরা অন্তত এক সপ্তাহ ঘটনাস্থলে থাকার পরিকল্পনা করেছেন।
এনটিএসবি জানিয়েছে, ২০০৮ সাল থেকে তারা রানওয়ে থেকে বিমান ছিটকে যাওয়া বা রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার ৩ হাজারের বেশি ঘটনা তদন্ত করেছে। হোমেন্ডি বলেন, ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা ঠেকাতে তদন্ত শেষে দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সূত্র: সিবিএস নিউজ