সংবাদ শিরোনাম

আলি আল-তাহের চূড়া নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, বাড়ছে উত্তেজনা

 প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

আলি আল-তাহের চূড়া নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, বাড়ছে উত্তেজনা ছবি-সংগৃহীত


আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পর্বতশ্রেণিতে ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে ইসরায়েল। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযানের পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার এ দাবি জানায়।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, বিরোধপূর্ণ ওই উচ্চভূমির নিচে থাকা একটি সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আলি আল-তাহের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচু।

কাটজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল লেবাননে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না, যতক্ষণ না পুরো লেবাননে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা হয় এবং গ্যালিলি অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য হুমকি দূর হয়। তাঁর ভাষায়, আলি আল-তাহের দখল সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এখনো ইসরায়েলের এই দাবির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কাটজের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে রয়টার্স জানায়, ইরান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল—আলি আল-তাহের এলাকায় ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকলে তারা কঠোর জবাব দেবে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় সংঘর্ষ চলছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল সংঘাত তীব্র করে। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়ার পর আবারও সংঘাত বাড়ে।

সর্বশেষ উত্তেজনার পর দক্ষিণ লেবাননে ‘নিরাপত্তা’ বা ‘বাফার’ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় ইসরায়েল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ওই অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিযানে বেসামরিক অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে কয়েক লাখ লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলেও তারা জানিয়েছে।

জুনে যুদ্ধবিরতি হলেও আলি আল-তাহেরের আশপাশে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান অব্যাহত ছিল। এর আগে ইসরায়েল কাছের বেউফোর্ট দুর্গ এবং দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর নজরদারি করা কিছু উঁচু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক মোহানাদ হাজে আলি মনে করেন, ইসরায়েলের সাফল্যের পেছনে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি লেবাননের শহর ও গ্রামগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘সংযম না থাকার’ বিষয়টিও কাজ করেছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েলের এসব কর্মকাণ্ডের কোনো পরিণতি হচ্ছে না। পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার মতো কর্মকাণ্ড এখন তারা করতে পারছে, যা আগে সম্ভব ছিল না। তাঁর মতে, এটি জাতিগত নিধনের শামিল।

হিজবুল্লাহর নীরবতায় প্রশ্ন
ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বলে দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান জোরদার করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্যও রয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, আলি আল-তাহেরের ওপর ইসরায়েলের ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত সাফল্য। এর ফলে দক্ষিণ লেবাননের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈরুতের সরকারের ওপর চাপ বাড়বে।

তাঁর মতে, ইসরায়েলের বার্তা স্পষ্ট-লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর মোকাবিলা করতে হবে, নইলে ইসরায়েল সেখানে অবস্থান বজায় রাখবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিজবুল্লাহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড বলেন, ইসরায়েলের দাবির বিষয়ে হিজবুল্লাহর নীরবতা বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর ধারণা, কোনো সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। আবার ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ইসরায়েল প্রকৃত অবস্থার চেয়ে বেশি কিছু বোঝাচ্ছে-এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, আলি আল-তাহেরের কতটা অংশ ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণ করছে কিংবা সেখানে থাকা অবকাঠামোর অবস্থা কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ব্ল্যানফোর্ডের মতে, হিজবুল্লাহ আবার প্রতিরোধে ফিরতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত এখন আর তাদের হাতে নেই; ইরানই আপাতত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতেই তারা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের নীরবতা নেতানিয়াহুর জন্য হতাশার কারণ হতে পারে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়টিকে তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আসছেন তিনি।

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ করলে দেশটির সামরিক বাহিনী ‘সব ধরনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত’ থাকবে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ। তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোসহ সব ধরনের অবকাঠামোয় হামলা চালানোর কথা বলেছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ইসরায়েলের নির্ভরতার কারণে বাস্তবে দেশটি কতটা এগোতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অক্টোবরে ইসরায়েলের নির্বাচন সামনে এবং বর্তমান জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর কঠিন অবস্থার ইঙ্গিত থাকায় দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ব্রেগম্যান প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান হিজবুল্লাহর পাশে দাঁড়াবে কি না। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুই সম্ভবত সেটি চান-কারণ ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।