সংবাদ শিরোনাম

দুই বিচারপতির বিরোধে উত্তপ্ত ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট

 প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫০ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

দুই বিচারপতির বিরোধে উত্তপ্ত ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দুই বিচারপতির পরস্পরের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংকটে পড়েছে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত একদিকে বিচারপতি আন্দ্রে মেনদোঁসার বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি বিবেচনা করছে, অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসের বিরুদ্ধেও তদন্ত হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন দে মোরায়েস ও মেনদোঁসা। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর বিরুদ্ধে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দে মোরায়েস। অন্যদিকে মেনদোঁসাকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন বোলসোনারো।

চলতি সপ্তাহে মেনদোঁসা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর সঙ্গে দে মোরায়েসের কথিত যোগাযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়।

এর জবাবে দে মোরায়েস অভিযোগ করেন, নথিগুলো সিলমোহর মুক্ত করে প্রকাশ করে মেনদোঁসা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

শুক্রবার প্রধান বিচারপতি এদসন ফাখিন জানান, মেনদোঁসার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য তিনি ব্রাজিলের অ্যাটর্নি জেনারেলকে পাঁচ দিন সময় দেবেন। একই সঙ্গে দে মোরায়েসের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে আদালত আগামী সপ্তাহে সিদ্ধান্ত নেবে।

ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণকারী সাংবাদিক ও গবেষক ফেলিপে রেকন্দোর মতে, এটি আদালতের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় সময় হতে পারে।

বিতর্কটি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন বোলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের মামলাও দেশটির রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে। ওই মামলার তত্ত্বাবধানে ছিলেন দে মোরায়েস। বোলসোনারো বর্তমানে গৃহবন্দী এবং অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০২২ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের পর বোলসোনারো ও তার কট্টর ডানপন্থী মিত্ররা নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার এবং ক্ষমতা হস্তান্তর ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে হামলা চালায় বোলসোনারোর সমর্থকেরা। অভিযোগ রয়েছে, ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি করা।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ বোলসোনারো ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সুপারিশ করে। বোলসোনারো অবশ্য মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে দাবি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও তাকে সমর্থন দিয়েছেন।

বোলসোনারোর মামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় দে মোরায়েস দীর্ঘদিন ধরেই ব্রাজিলের ডানপন্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রাম্বল ও এক্সের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অর্থ মন্ত্রণালয় একসময় তার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল।

দে মোরায়েসকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল তেমের। তেমের মধ্য-ডানপন্থী রাজনীতিক হলেও বোলসোনারোসহ ডানপন্থীদের বিভিন্ন স্পর্শকাতর মামলায় ভূমিকার কারণে দে মোরায়েস এখন তাদের অন্যতম প্রধান সমালোচনার লক্ষ্য।

ব্রাজিলের রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা। রেকন্দোর ভাষায়, আদালত সেই ভারসাম্য থেকে সরে গেলে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোকে ঘিরে কথিত বড় ধরনের জালিয়াতির তদন্ত নতুন করে আদালতের ওপর চাপ তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশ করা নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভোরকারো কোনো এক সময়ে দে মোরায়েসের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন।

বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিকদের একাংশ দে মোরায়েসের সঙ্গে ভোরকারোর সম্পর্কের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। কেউ কেউ তার পদত্যাগও চেয়েছেন।

এরই মধ্যে আগামী ৪ অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাজিলের রাজনৈতিক লড়াই আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে বামপন্থী লুলার মুখোমুখি হচ্ছেন বোলসোনারোর বড় ছেলে, সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো।

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক বিতর্ককে কাজে লাগাতে চাইছে ডানপন্থী শিবির। ফ্লাভিও বোলসোনারো অভিযোগ করছেন, তার বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধ্বংস করতে দে মোরায়েস ও বামপন্থীদের মধ্যে ষড়যন্ত্র চলছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘লুলা ও মোরায়েসকে বিদায়। দেশ পরিচালনায় এই জুটির আর কোনো জায়গা নেই। পরিবর্তনের সময় এসেছে। ব্রাজিল জয়ী হবে।’

তবে ভোরকারোর সঙ্গে যোগাযোগের কারণে ফ্লাভিও নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্ট ব্রাজিল ভোরকারো ও ফ্লাভিওর মধ্যে কথিত কিছু বার্তা প্রকাশ করে। সেখানে বোলসোনারোর জীবন নিয়ে নির্মিতব্য একটি চলচ্চিত্রের জন্য অর্থায়নের অনুরোধের বিষয় উঠে আসে।

ভোরকারো ওই চলচ্চিত্র প্রকল্পে কয়েক মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ফ্লাভিও কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত প্রকল্প।
সূত্র: আলজাজিরা