যুদ্ধ ইরানকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে: মার্কিন গোয়েন্দারা
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন, ছয় মাসের যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা এবং দীর্ঘ সময় সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে ইরান এখন আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী। যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে কয়েক মাস ধরে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও তেহরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
চলতি সপ্তাহে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই মূল্যায়ন সামনে এসেছে। এখন পর্যন্ত নতুন হামলা ও পাল্টা হামলা সীমিত থাকলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের কট্টরপন্থী সরকার বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টির কথা বিবেচনা করতে পারে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে তেহরান প্রস্তুত-এমন লক্ষণ খুব কম।
নভেম্বরের নির্বাচন ঘিরে হিসাব
কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অন্তত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইতে পারে ইরান। তেহরানের হিসাব হতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও উচ্চ জ্বালানি মূল্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছেন না। তাঁর ধারণা, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় আদায় করা সম্ভব।
তবে গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নিষেধাজ্ঞার চাপ উল্টো ইরানকে আরও সংঘাতমুখী করে তুলতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে আস্থা
ইরানের সামরিক কৌশলে দেশটির ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতার ওপরও তেহরান গুরুত্ব দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটির সদস্য ও কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট জেসন ক্রো বলেন, ইরানের নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান নিয়ে ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তাঁর ভাষায়, ইরানিরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশ আশাবাদী। তবে ইরান যে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, সেটিও স্বীকার করেন তিনি।
গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত আরও কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান হয়তো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসায় ওয়াশিংটন বড় ধরনের নতুন হামলা চালাতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে।
নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট ও গোয়েন্দা কমিটির সদস্য জশ গটহাইমার বলেন, ইরান মনে করছে তাদের হাতে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, তেহরানের দৃষ্টিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখাই স্বার্থের অনুকূল হতে পারে।
সাইবার হামলার নতুন ফ্রন্ট
যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলার ক্ষেত্রেও নতুন একটি ফ্রন্ট খুলেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলার পেছনে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা জড়িত ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এসব হামলায় পানীয় পানি অনিরাপদ হয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কিছু হামলার কারণে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সামাল দিতে ম্যানুয়ালি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে এবং সতর্কতামূলকভাবে পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।
ইরানি হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে ক্ষতির মুখে পড়ার পর ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার হ্যাকাররা আবার সংগঠিত হয়ে থাকতে পারে। সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের কাছে এ ধরনের হামলা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে, কারণ সীমিত পরিসরের বিঘ্নও দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনসমর্থন দুর্বল করতে পারে।
ইরানি হ্যাকার গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজর রাখা সাবেক মার্কিন সরকারি সাইবার নিরাপত্তা ঠিকাদার অ্যালেক্স অরলিন্সের মতে, ইরানের সাইবার অপারেটররা সম্ভবত আগের চেয়ে বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে। তাঁর সতর্কতা, হামলা সফল না হলেও তা মার্কিন জনগণের যুদ্ধ নিয়ে ধৈর্য ক্ষয় করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে।
মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাবের চেষ্টা
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রচারণামূলক তথ্য ছড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা।
সম্প্রতি মেটা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দেওয়া ইরানভিত্তিক ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের একটি ছোট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে।
সব মিলিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এমন একটি ইরানের চিত্রই উঠে এসেছে, যে দেশটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও নিজেকে পরাজিত মনে করছে না। ছয় মাসের যুদ্ধ বরং তেহরানের এই বিশ্বাস আরও জোরদার করতে পারে যে তারা হামলা সহ্য করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে পারবে।