বিদেশি অর্থের অভিযোগে চাপে ফারাজের রিফর্ম
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কে পড়েছে অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে। গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে দলের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বিদেশি অর্থ গ্রহণসংক্রান্ত নির্বাচনী আইন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে দেখা গেছে-এমন অভিযোগ প্রকাশের পর শুক্রবার তাঁরা পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ৪-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিষয়টি সামনে আসে। এর পর রিফর্ম ইউকে অভ্যন্তরীণ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘ফাঁদে ফেলার চেষ্টা’ বলে দাবি করেছেন।
গোপন ক্যামেরায় কী ধরা পড়েছে
চ্যানেল ৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিফর্মের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড্যান জুকস ও জেমস অরকে গোপন ক্যামেরায় এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যায়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
একটি ভিডিওতে জুকসকে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ পাউন্ড বা প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার ডলার অনুদান নেওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওই অর্থদাতা সরাসরি দলকে অর্থ না দিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী তাঁর ছেলের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
তবে ওই ‘ছেলে’ আসলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ভার্বাটিমের একজন সাংবাদিক ছিলেন। তিনি গোপনে কথোপকথনটি ধারণ করেন।
অন্য একটি ভিডিওতে অরকে সরাসরি দলকে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে রিফর্ম ইউকের পক্ষে জনমত জরিপের খরচ বহন করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। তাঁকে বলতে শোনা যায়, দলটির পক্ষে অর্থ দেওয়ার মতো যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী দাতা বা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান নেই।
ভার্বাটিমের দাবি, অনুসন্ধানের সময় রিফর্মের কর্মকর্তারা ওই মার্কিন অর্থদাতাকে দিয়ে তিনটি জনমত জরিপের জন্য ৩০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে ওই অর্থের উৎস প্রকাশ করা হয়নি। চ্যানেল ৪ জানিয়েছে, তারা ভার্বাটিমের অনুসন্ধানের তথ্য যাচাই করেছে।
বিদেশি অর্থ নিয়ে ব্রিটিশ আইন কী বলে
ব্রিটিশ নির্বাচনী আইনে রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ব্রিটিশ ভোটার বা যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান নিতে পারে। বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি বা বিদেশি সংগঠনের সরাসরি অনুদান গ্রহণ নিষিদ্ধ।
ব্রিটেনের নির্বাচন কমিশন শুক্রবার জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোকে ১১ হাজার ১৮০ পাউন্ডের বেশি বৈধ অনুদান এবং ৫০০ পাউন্ডের বেশি অবৈধ অনুদানের তথ্য জানাতে হয়।
কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথাযথ রাখা তাদের দায়িত্ব। অনুদানের বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাব্য চেষ্টা হলে বিষয়টি পুলিশকে বিবেচনা করতে হবে।
রিফর্মের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদন প্রচারের পর প্রথমে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে রিফর্ম ইউকে। দলটি অভিযোগগুলোকে ‘প্রতারণামূলক ফাঁদ’ বলেও দাবি করে।
পরে অবস্থান বদলে দলটি জানায়, তারা অভ্যন্তরীণ তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীতিবিষয়ক প্রধান জেমস অর এবং ফারাজের দীর্ঘদিনের সহযোগী ড্যান জুকস দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
অর বলেন, তিনি সাময়িকভাবে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছেন এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। জুকসও কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে নিজের নাম পরিষ্কার করার জন্য রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন।
ফারাজ গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘ফাঁদে ফেলার’ অভিযোগ তুলেছেন। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম এলবিসিকে তিনি বলেন, দলের কয়েকজন ঠিকাদার এমন কিছু কথা বলেছেন, যা বলা উচিত ছিল না। তাঁর দাবি, এ কারণেই তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফারাজ আরও বলেন, দল কোনো আইন ভাঙেনি এবং কোনো সন্দেহজনক অর্থও গ্রহণ করেনি।
আইনি ব্যবস্থা হতে পারে?
রিফর্ম ইউকের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত করতে পুলিশের কাছে চিঠি দিয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, সম্প্রচারিত প্রতিবেদনে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তারা অবগত। তাদের কাছে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। তবে এর অর্থ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে-এমন নয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক
নতুন এই অর্থ কেলেঙ্কারি রিফর্ম ইউকের জন্য আরও একটি রাজনৈতিক ধাক্কা। গত দুই বছরে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়লেও সাম্প্রতিক জনমত জরিপে সেই অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে।
গত বছর ইউগভের এক জরিপে রিফর্মকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখা হয়েছিল। তখন জাতীয় নির্বাচন হলে দলটি ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বিপরীতে লেবারের সম্ভাব্য আসন ছিল ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সাবেক ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভদের মাত্র ৭ শতাংশ।
কিন্তু চলতি সপ্তাহের ইউগভ জরিপে রিফর্ম ও লেবার-দুই দলের সমর্থনই ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কনজারভেটিভরাও ২০ শতাংশে উঠে এসেছে।
রিফর্ম ইউকের জন্য অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। গত জুলাইয়ে ফারাজ ক্ল্যাকটন আসনের এমপি পদ থেকে নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে, দণ্ডিত প্রতারক জর্জ কটরেল ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ফারাজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার জন্য তিনজন কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের অর্থ দিয়েছিলেন। ফারাজের ব্যবহারের জন্য বাকিংহাম প্যালেসের কাছে পাঁচতলা একটি জর্জিয়ান টাউনহাউসের ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে উপনির্বাচনে ক্ল্যাকটন আসনটি আবারও জিতে নেন ফারাজ। তবে থাইল্যান্ডভিত্তিক ধনকুবের ও ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারী ক্রিস্টোফার হারবার্নের কাছ থেকে ৫০ লাখ পাউন্ড বা প্রায় ৬৭ লাখ ডলারের অঘোষিত অর্থ পাওয়ার অভিযোগে ফারাজকে এখনো সংসদীয় তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ওই অর্থ দিয়ে ফারাজ ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার আগে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খরচ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। ফারাজ কোনো অনিয়মের অভিযোগই স্বীকার করেননি।
এ সপ্তাহে বিবিসিকে ফারাজ বলেন, সংসদীয় তদন্তটি অন্যায্য। তাঁর অভিযোগ, রিফর্মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে কোনো না কোনোভাবে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছে।
তবে ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি লন্ডনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাস্টিন ফিশারের মতে, নতুন এই অর্থ কেলেঙ্কারি ফারাজের দলের ভেতরে ও বাইরে তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল করতে পারে এবং পরবর্তী নির্বাচনে রিফর্মের ভোট কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফিশারের ভাষায়, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলে রিফর্ম হয়তো তা সামলে নিতে পারত। কিন্তু ফারাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুদান এবং রিফর্মের একটি অনুদানের বিদেশি যোগসূত্র নিয়ে আগের প্রশ্নগুলোর সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় দলটির জন্য তৈরি হওয়া নেতিবাচক বয়ান এড়িয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা