নিরাপদ পানির অভাবে গাজায় মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে। ক্ষতিগ্রস্ত লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট, পানির কূপ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এতে সেখানে তৈরি হয়েছে গভীরতর জনস্বাস্থ্য সংকট।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, পানি অবকাঠামোয় বারবার হামলা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় পৌঁছাতে নানা বাধার কারণে গাজার বড় অংশের মানুষ এখন কার্যকর জনসাধারণের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বদলে পানির ট্যাংকার ও জরুরি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
সর্বশেষ আগস্টের শেষ দিকে শেখ রাদওয়ান ও দেইর আল-বালাহ এলাকায় বেশ কয়েকটি পানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি কূপ ও লবণমুক্তকরণ স্থাপনাও রয়েছে, যেটি চার হাজারের বেশি মানুষকে পানি সরবরাহ করত।
চলমান সংঘাতের শুরু থেকেই গাজার পানি অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত গাজার পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর ৬৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ৭৬টি পৌর লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট এবং ১৯৪টি পানি উত্তোলনকারী কূপ।
ইউনিসেফ বর্তমানে গাজায় প্রায় ১৬টি ছোট আকারের লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট ও সংস্কার করা ৪৮টি কূপকে সহায়তা করছে। তারপরও ঘনবসতিপূর্ণ গাজা সিটি ও খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট ভয়াবহ।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স বা এমএসএফের হিসাবে, গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র পানি-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এমএসএফের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি বিভাগের উপসমন্বয়ক মুনইয়া আল-রাইনি বলেন, সেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ দশমিক ৫ লিটার পানীয় পানি পাচ্ছেন।
মানবিক প্রয়োজন মেটাতে একজন মানুষের প্রতিদিন অন্তত ২১ লিটার পানি প্রয়োজন-পান করা, রান্না, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য মৌলিক কাজে। বর্তমান সরবরাহ সেই মাত্রার অনেক নিচে।
আল-রাইনি বলেন, এটি আর শুধু পানির সংকট নয়; গাজার পানি ও পয়োনিষ্কাশন-দুই ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার পরিণতি এখন মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় একটি কার্যকর জনসাধারণের পানি নেটওয়ার্কের বদলে ট্যাংকার ও জরুরি মানবিক সহায়তাই পানির প্রধান উৎস।
লবণমুক্তকরণ স্থাপনা, গভীর কূপ, জেনারেটর ও পানি সরবরাহের নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিরাপদ পানির পরিমাণ সরাসরি কমেছে। চালু থাকা স্থাপনাগুলোও সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, পানি শোধনের রাসায়নিক, লুব্রিকেন্ট ও ইঞ্জিন তেলের সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
ইউনিসেফের মুখপাত্র লুইস ওয়াটারিজের তথ্য অনুযায়ী, গাজার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি অবকাঠামোর প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত। পানি সরবরাহের মূল নেটওয়ার্কের বড় অংশ অচল থাকায় প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবার পানীয় পানির জন্য ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করছে।
তারপরও সরবরাহ যথেষ্ট নয়। গাজার ৬৩ শতাংশ মানুষ দিনে ছয় লিটার পানীয় পানিও পাচ্ছেন না। অথচ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে একজন গাজাবাসী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ লিটার পানি ব্যবহারের সুযোগ পেতেন।
এই সংকটের প্রভাব তৃষ্ণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন দূষিত বা অপরিশোধিত পানি পান করতে বাধ্য হলে শিশুদের অসুস্থতা, অপুষ্টি ও শারীরিক বিকাশে বাধা তৈরি হতে পারে। শিশুদের শরীরের ওজনের তুলনায় পানির প্রয়োজন বেশি এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
ইউনিসেফের ওয়াটারিজের মতে, দীর্ঘ সময় অপরিশোধিত পানি পান করলে শিশুদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। পানিতে জীবাণুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা শরীরের পুষ্টি শোষণে বাধা দিয়ে শিশুদের খর্বাকৃতি ও অতিরিক্ত ওজনহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর প্রভাব শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
পানি সংকট গাজার ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হাসপাতালগুলোতে পানীয়, পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিষ্কার পানির প্রয়োজন। সেই সরবরাহ ব্যাহত হলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে, ঠিক এমন সময়ে যখন হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্ষতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, জমে থাকা বর্জ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত স্যানিটেশন নেটওয়ার্কের কারণে পানির উৎস দূষিত হওয়ার এবং সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, তাদের চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশের অসুস্থতা ছিল তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ৩১ শতাংশের ছিল চর্মরোগ এবং ২১ শতাংশের ছিল তীব্র পানিজনিত ডায়রিয়া। সংস্থাটির ভাষ্য, এসব অসুস্থতার বড় একটি অংশ যথাযথ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকলে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গাজার ছয়টি পয়োনিষ্কাশন শোধনাগারই এখন বন্ধ। ইউনিসেফ জানিয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ পয়োনিষ্কাশন পাম্পিং স্টেশনও অচল। প্রতিদিন আনুমানিক ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি পরিবেশে গিয়ে পড়ছে।
এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানি, বসতিপূর্ণ এলাকা ও বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজার উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে গাজা সিটি ও নর্থ গাজা, এবং দক্ষিণের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সীমান্তবর্তী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এবং তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর আশপাশে থাকা মানুষের দুর্ভোগও তীব্র। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোয় মেরামতের কাজ করতে মানবিক সহায়তাকর্মীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে পানির ট্যাংকার পৌঁছাতেও রয়েছে বড় বাধা।
তারপরও বহু মানুষ ভূগর্ভস্থ কূপ ও ট্যাংকারের পানির ওপর নির্ভর করে টিকে আছেন। ইউএনআরডব্লিউএর তথ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় চালু থাকা কূপ বা লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট থেকে পানি তুলে ট্যাংকারে করে বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছাকাছি পানির পয়েন্ট ও সংরক্ষণ ট্যাংকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তবে এটি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা, স্থায়ী সমাধান নয়। ইউএনআরডব্লিউএ বলছে, উৎসে পানি পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিরাপদ পানি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি এই ব্যবস্থা গাজার ধ্বংস হয়ে যাওয়া পানি অবকাঠামোর বিকল্প হতে পারে না।
ধ্বংসের মাত্রা এত বেশি যে অনেক স্থাপনায় সাধারণ মেরামত যথেষ্ট হবে না; বড় ধরনের সংস্কার কিংবা পুরোপুরি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন হবে। পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সরবরাহ প্রবেশে বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এমএসএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশের একাধিক আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও পানির ট্যাংকার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন তেলের আবেদনও ছিল। ১২ আগস্ট সংস্থাটি জানায়, ইঞ্জিন তেল ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটে জেনারেটর, অ্যাম্বুলেন্স, পানির পাম্প ও পানির ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে সংকটটি আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পানির সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, আর জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের সংকট সেই অবকাঠামো মেরামত এবং জরুরি পানি সরবরাহ-দুটিই কঠিন করে তুলছে।
মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, শুধু ট্যাংকারে পানি সরবরাহ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট, কূপ, পানি পাম্পিং স্টেশন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পানি শোধনের উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং ব্যাপক অবকাঠামো পুনর্গঠন।
তবে অবকাঠামো পুনর্গঠন শুরু হলেও সংকটের সব প্রভাব দ্রুত কাটবে না। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, বারবার সংক্রমণ ও দূষিত পানি পানের কারণে শিশুদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার কিছু প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।
গাজার পানি সংকট তাই এখন আর শুধু প্রতিদিন কত লিটার পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে-তার হিসাব নয়। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধ্বংসের ফলে যে স্বাস্থ্য ও বিকাশগত ক্ষতি তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব কত বছর বা কত প্রজন্ম পর্যন্ত থাকবে-সেটিই হয়ে উঠছে বড় উদ্বেগ।
সূত্র: আরব নিউজ