ব্রাজিল নির্বাচনের আগে দুর্নীতির তদন্তে ফ্লাভিও
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এর মধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছেন দেশটির ডানপন্থী প্রার্থী ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও কর ফাঁকির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশ করা নথিতে জানা যায়, ফেডারেল পুলিশের অনুরোধে গত জুলাইয়ে বিচারপতি আন্দ্রে মেনদোঁসা ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছেন ধসে পড়া ব্যাংক বানকো মাস্টারের সাবেক প্রধান ড্যানিয়েল ভোরকারো। তাঁর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক জালিয়াতি পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। গত মার্চে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ফেডারেল পুলিশের হিসাবে, ভোরকারোর পরিচালিত জালিয়াতির ঘটনায় প্রায় আট লাখ ব্যাংক গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রতারণার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভোরকারোর মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা বলছেন, ২০২৫ সালে ফ্লাভিওর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি তহবিলে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ডলার পাঠানো হয়েছিল।
তদন্তকারীদের ধারণা, অর্থটি ২০২৬ সালে মুক্তি পাওয়ার কথা থাকা ‘ডার্ক হর্স’ নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য দেওয়া হয়েছিল। ছবিটিতে ফ্লাভিও ও এদুয়ার্দোর বাবা জইর বলসোনারোকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, তদন্তকারীরা এখন ওই অর্থের উৎস, কোন কোন প্রতিষ্ঠান অর্থ স্থানান্তরে যুক্ত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কারা এর সুবিধাভোগী হয়েছে-তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
নথিতে থাকা একটি স্ক্রিনশট থেকে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এদুয়ার্দো ভোরকারোকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তহবিল কীভাবে পরিচালনা করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তবে এদুয়ার্দো বলসোনারো অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শুক্রবার রয়টার্সকে তিনি বলেন, অর্থগুলোকে ঘুষ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সত্য নয়।
এদুয়ার্দোর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসের হস্তক্ষেপ থেকে অর্থগুলোকে সুরক্ষিত রাখতেই স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ডানপন্থীদের কাছে মোরায়েস দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু।
২০২৫ সালে জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের মামলার তদারকি করেছিলেন মোরায়েস। ওই মামলায় সাবেক প্রেসিডেন্টকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ চাওয়ার অভিযোগে এদুয়ার্দোর বিরুদ্ধে হওয়া পৃথক মামলাতেও মোরায়েস যুক্ত ছিলেন। ওই মামলায় এদুয়ার্দোও দোষী সাব্যস্ত হন।
নির্বাচনের আগে চাপ
ফ্লাভিও বলসোনারোর সঙ্গে ভোরকারোর সম্পর্কের অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে মে মাসে। তখন ইন্টারসেপ্ট ব্রাজিল দুজনের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া কিছু ফাঁস হওয়া বার্তা প্রকাশ করে।
ফ্লাভিও অবশ্য কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বাবাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শুধু বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন।
আগামী ৪ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে লড়ছেন ফ্লাভিও। নির্বাচনী জরিপে এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীই সরাসরি জয়ের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছেন না। ফলে নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি।
বানকো মাস্টার কেলেঙ্কারি নিয়ে ফ্লাভিও ও লুলা-দুজনই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন।
শুক্রবার এক নির্বাচনী প্রচারে ফ্লাভিও বলেন, সবকিছু এবং সবাইকে স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করা হোক। কী ঘটেছে তা সংবাদমাধ্যম ও জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক-এমন আহ্বান জানান তিনি।
এর এক দিন আগে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে লুলাও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, কার ক্ষতি হলো তা বিবেচনা না করে সবকিছু তদন্ত এবং প্রকাশ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এদসন ফাখিন চলতি সপ্তাহে বানকো মাস্টার মামলার নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়ার পরই ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি সামনে আসে। এতে হাজার হাজার পৃষ্ঠার আদালতের নথি প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এই কেলেঙ্কারিতে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির সম্পৃক্ততা নিয়েও আদালতের ভেতরে টানাপোড়েন চলছে। বিচারপতি মেনদোঁসা চলতি মাসের ১ তারিখে ভোরকারোর সঙ্গে বিচারপতি মোরায়েসের যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশ করেন।
মোরায়েস পাল্টা অভিযোগ করেন, মেনদোঁসা নিজের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব নথি প্রকাশ করেছেন এবং প্রসিকিউটর বা পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই ভোরকারোর সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকের চেষ্টা করেছেন।
আগামী সপ্তাহে মোরায়েসের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বানকো মাস্টার কেলেঙ্কারির সদ্য প্রকাশিত নথিগুলোর সামগ্রিক প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে তদন্তসহ মামলার কিছু অংশ এখনো গোপন রাখা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা