ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র, সৌদিতে হামলার সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার অভিযোগ করেছে, হুথিদের গোলাবর্ষণে তিন শিশু নিহত হয়েছে। অন্যদিকে হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি বাহিনী ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ভোরে সৌদি আরবের কয়েকটি প্রদেশে সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। সৌদি অবকাঠামোয় হুথিদের হামলার অভিযোগের মধ্যেই এসব সতর্কতা দেওয়া হয়। হুথিরা বলেছে, সৌদি বিমান হামলার জবাব দেবে তারা।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে। মঙ্গলবার পাকিস্তান সতর্ক করে বলেছে, সৌদি আরবে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সম্প্রতি সই হওয়া মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট থেকে ইয়েমেনের সংঘর্ষে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক দশক হাজার মানুষ।
বুধবার সরকারি বার্তা সংস্থা সাবা জানায়, মধ্যাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশে হুথিদের গোলাবর্ষণে অন্তত তিন শিশু নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একই ধরনের এটি দ্বিতীয় হামলা বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে প্রথম হামলায় দুই শিশু নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছিল।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশের একটি কারাগারে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩২ হয়েছে বলে জানিয়েছে হুথিরা। মঙ্গলবারের ওই হামলায় আরও সাতজন আহত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
সংঘাতের নতুন বিস্তার
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেন সংঘাতে জর্জরিত। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করলে পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ সংঘাতে আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ নিহত হন।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলে বড় ধরনের লড়াই অনেকটা থেমে যায়। তবে জুলাইয়ে হুথি-নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে হামলার পর আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
গত সপ্তাহে হুথিরা হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মানদাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্যও এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ।
এর জবাবে সরকারপন্থী বাহিনী পাল্টা হামলা চালায় এবং দেশের অন্য এলাকাতেও অভিযান বাড়ায়। এর মধ্যে আল-জাওফ প্রদেশও রয়েছে, যেটিকে রাজধানী সানার দিকে যাওয়ার অন্যতম প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সংঘাতের প্রভাব এবার সৌদি আরবেও পড়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি বুধবার বলেন, হুথিরা সৌদি আরবের স্থাপনা ও অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রেখেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে খামিস মুশাইত, আবহা ও জাজানকে লক্ষ্য করার অভিযোগ করেন তিনি।
হুথিদের এসব হামলাকে ‘জঘন্য’ আখ্যা দিয়ে এর জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন আল-মালিকি।
বৃহস্পতিবার ভোরে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইত ও আবহায় একাধিক সতর্কতা জারি করে। বুধবারও একই এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এসব সতর্কতার সঙ্গে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
বুধবারের হামলার পর হুথিরা সৌদি বিমান হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয়। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, সৌদি বাহিনী ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের ছয়টি প্রদেশে ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল আল-জাওফ, মারিব, তাইজ, হোদেইদা, সাদা ও আল-বায়দা।
হামলায় হতাহতের বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি। তবে তাঁর দাবি, হামলায় ব্যবহৃত বিমানগুলো খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং তাইফের কিং ফাহদ বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে।
সারি এর আগে মঙ্গলবার দাবি করেছিলেন, কয়েক দিন ধরে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে আল-জাওফের আল-হাজমের একটি কারাগারেও হামলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর জবাবে আবহা, নাজরান ও জিজানে সৌদি আরামকোর স্থাপনা, ইকোনমিক সিটি এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করে হুথিরা। সৌদি কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন, হুথিদের হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে
এদিকে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনী জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আল-জাওফে অগ্রসর হয়েছে। বির আল-মারাজিকের আশপাশে পৌঁছে হুথিদের সরবরাহের পথ বিচ্ছিন্ন করার দাবিও করেছে তারা। তাইজে হুথিদের অবস্থানেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে বাহিনীটি।
পশ্চিম উপকূলে হুথিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স বাহিনীকে শক্তিশালী করতে বুধবার অতিরিক্ত সেনা পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত মাসে ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে আবারও বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে চুক্তিটি কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইয়েমেনে চলমান পরিস্থিতি যদি সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়ে বা সৌদি আরব বিনা উসকানিতে হামলার শিকার হয়, তাহলে মক্কা চুক্তি কার্যকর হবে।
ইরান অবশ্য ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চলতি সপ্তাহে আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য ইরানের সমালোচনা করেন এবং দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা আকাশসীমার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে-এমন কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানান।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণভাবে’ প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলেছে, তারা বরাবরই ইয়েমেনের ঐক্য ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত রোডম্যাপের ভিত্তিতে ইয়েমেনিদের নেতৃত্বে সংলাপকে সমর্থন করে।
সূত্র: আলজাজিরা