সংবাদ শিরোনাম

আইএইএর কড়াকড়ি! ইরানের পরমাণু কার্যক্রমে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করছে

 প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

আইএইএর কড়াকড়ি! ইরানের পরমাণু কার্যক্রমে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করছে ছবি- সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর নজরদারি ও পরিদর্শন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারস্থ হয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। বুধবার সংস্থাটির গভর্নরস বোর্ড ইরানকে পারমাণবিক নিরাপত্তা চুক্তির বাধ্যবাধকতা না মানার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিবেদন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

গভর্নরস বোর্ডের ৩৫ সদস্যের মধ্যে ২৩টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। রাশিয়া, চীন ও নাইজার বিপক্ষে ভোট দেয়। ২০২৫ সালের জুনে ইরানকে পারমাণবিক নিরাপত্তা বিধি না মানার জন্য দায়ী করা এক প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় বুধবারের এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আইএইএর সঙ্গে টানাপোড়েন অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি-জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)-এর অধীনে দেশটির পরমাণু কর্মসূচির ওপর বিশ্বের অন্যতম কঠোর ও বিস্তৃত নজরদারি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। এতে সিল, ক্যামেরা, সেন্সর, নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন এবং সন্দেহজনক গোপন স্থাপনা তদন্তের সুযোগ ছিল।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর আইএইএ জানায়, ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলছে। ২০১৮ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিলেও ২০১৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরান পরিদর্শন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বেশির ভাগ শর্ত মেনে চলেছিল।

এরপর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে আইএইএর পরিদর্শকেরা জানান, ইরান জেসিপিওএতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কম-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। একই বছরের শরতে চুক্তিতে নিষিদ্ধ স্থাপনায় উন্নত সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণও শুরু করে তেহরান।

২০২০ সালে চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগের সময়ে পারমাণবিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে সন্দেহ করা দুটি স্থাপনায় আইএইএর পরিদর্শকদের প্রবেশে বাধা দেয় ইরান। একই বছরের ডিসেম্বরে ইরানের পার্লামেন্ট এমন একটি আইন পাস করে, যার ফলে আইএইএর বাড়তি নজরদারি ও যাচাই কার্যক্রম আরও সংকুচিত হয়।

ওই আইনে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা কমাতে ব্যর্থ হলে ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এই মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অস্ত্র তৈরির উপযোগী প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার পর্যায়ে দ্রুত নেওয়া সম্ভব।

২০২১ সালের মাঝামাঝি আইএইএর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। ইরানের কারাজে সেন্ট্রিফিউজ তৈরির একটি কারখানায় নজরদারি ক্যামেরা অচল করে দেওয়া হয়; একটি ক্যামেরা ধ্বংসও করা হয়। পরে ২০২২ সালের জুনে ইরান আইএইএর জেসিপিওএ-ভিত্তিক সব নজরদারি সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে বলে।

২০২১ সালে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আইএইএর পরিদর্শকদের ‘অতিরিক্ত ও আক্রমণাত্মক’ শারীরিক তল্লাশি চালিয়ে হয়রানি করেন বলেও সংস্থাটি জানিয়েছিল।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ফোরদো পরমাণু স্থাপনায় আইএইএ এমন সেন্ট্রিফিউজের সন্ধান পায়, যেগুলো ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছিল। এই মাত্রা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার খুব কাছাকাছি।

একজন অভিজ্ঞ রুশ পরিদর্শক সেন্ট্রিফিউজের পাইপলাইনে সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করার পর বিষয়টি ধরা পড়ে বলে সাবেক এক মার্কিন কূটনীতিক জানিয়েছেন। কয়েক মাস পর ওই পরিদর্শকসহ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অভিজ্ঞ আরও কয়েকজন আইএইএ বিশেষজ্ঞকে ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয়।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি তখন এই বহিষ্কারকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পর্যবেক্ষণে সংস্থাটির সক্ষমতার জন্য ‘গুরুতর আঘাত’ বলে অভিহিত করেন।

এরপর ইরান ও আইএইএর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও ওঠে। পরিদর্শনে বাধা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখা এবং ঘোষণার বাইরে থাকা পরমাণু স্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না দেওয়ার অভিযোগের পর ২০২৫ সালের জুনে আইএইএর বোর্ড ইরানকে পারমাণবিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করে।

এর পরদিনই ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। প্রায় দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়।

ইরান অবশ্য আইএইএর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বুধবারের ভোটের আগে ইরানের আইএইএ মিশন প্রস্তাবটিকে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘ঐকমত্য ছাড়া গৃহীত’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের দাবি, আইএইএ কখনোই পরমাণু উপকরণ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি।

পরিদর্শন বন্ধ, তথ্যের ধারাবাহিকতা ভেঙেছে

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী বিমান হামলা শুরুর পর আইএইএ ইরানের কোনো পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারেনি; শুধু বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার স্থাপনাগুলোতেও সংস্থাটির পরিদর্শকেরা যেতে পারেননি।

এর ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম, সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর আইএইএর ‘ধারাবাহিক নজরদারি’ নষ্ট হয়েছে। এখন এসব উপকরণের পরিমাণ, অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংস্থাটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।

সাবেক মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্মকর্তা এরিক ব্রুয়ারের মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে আইএইএ এখন ‘বড় ধরনের ঘাটতি’ নিয়ে কাজ করছে। পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে আরও শক্তিশালী নজরদারি এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পরমাণু নীতি বিভাগের প্রধান জেমস অ্যাক্টনের আশঙ্কা আরও গভীর। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক-দুই দিক থেকেই ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চাইলে শেষ পর্যন্ত তা করতে পারে। আগামী তিন বছরের মধ্যে ইরানের পরমাণু বোমা পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বলে তিনি ধারণা করছেন।

এখন সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা পরিষদের

ইরানকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ এখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হাতে। ২০০৬ সালে সর্বশেষ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল। এরপর তেহরানের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয় এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। রাশিয়া ও চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় যেকোনো প্রস্তাবে তারা ভেটো দিতে পারে। ফলে বুধবারের আইএইএ-র পদক্ষেপের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কার্যকর হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো ব্যবস্থা তেহরানের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

সূত্র: সিএনএন