হরমুজে তেলবাহী জাহাজে হামলা, বিপন্ন উপসাগরের পরিবেশ
ছবি- সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় এবার বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই জলপথের আশপাশে তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়ায় উপসাগরের পানিতে ভয়াবহ তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। এর তিন দিন আগে আরও তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। এসব হামলার পর ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি, হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন একটি বিমানবাহী রণতরি ও নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর পাল্টা হামলা চালানো হয়। পরে ইরানও প্রণালির ভেতর দিয়ে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজ এবং অন্যত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলার কথা জানায়।
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় হরমুজ প্রণালি কার্যত পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বহনকারী জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে বা আশপাশে অপেক্ষা করে। কোনো জাহাজে বড় ধরনের হামলা হলে আগুন, জাহাজডুবি কিংবা বিপুল পরিমাণ তেল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঝুঁকিতে লাখ লাখ ব্যারেল তেল
মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৪২টি তেলবাহী জাহাজ। উপসাগরীয় অঞ্চল ও ওমান উপসাগরে আরও শত শত জাহাজ অপেক্ষা করছিল বা ধীরগতিতে চলছিল। অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর মধ্যে ১৮টি তেল বহন করছিল।
এসব জাহাজে ঠিক কত পরিমাণ তেল ছিল, তা জানা যায়নি। তবে সম্মিলিতভাবে এগুলোর তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বহনের সক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার। এই পরিমাণ তেল হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার তেল প্রায় ১১ কোটি ব্যারেল নয়, বরং প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেলের সমান। এটি বিশ্বের এক দিনের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশের সমান। পরিমাণটি প্রায় ৭১৪টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল ভর্তি করার মতো।
কোনো বড় তেলবাহী জাহাজে হামলা বা জাহাজডুবি হলে লাখ লাখ লিটার তেল উপসাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্রোত ও বাতাসের সঙ্গে তেল দ্রুত বিস্তৃত হয়ে উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
এরই মধ্যে তেল ছড়ানোর ঘটনা
গত কয়েক দিনে অন্তত ৭৫টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে সেন্টকম জানিয়েছে। এতে অন্তত ২১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে দুটি ঘটনায় ছোট আকারের তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছয়টি ঘটনায় আগুন লেগেছে।
ওমানের উপকূলেও এরই মধ্যে তেল ছড়িয়ে পড়ছে। জুনের শুরুতে বিস্ফোরণের আশঙ্কা জানানোর পর ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে আটকে যায়। রয়টার্সের হিসাবে, জাহাজটিতে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, ছড়িয়ে পড়া তেল রাস আল-মাদরাকার কাছাকাছি প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূল এবং মাসিরাহ দ্বীপকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৩ আগস্ট লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ ওমানের কাছে অজ্ঞাত কোনো বস্তুতে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। ১০ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে বড় তেলজাতীয় আস্তরণ দেখা যায়। সিররি দ্বীপের কাছেও আরেকটি তেল ছড়িয়ে পড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, কেশমের আস্তরণটি মিনোয়ান পাইওনিয়ার থেকে এসেছে, যদিও এর উৎস স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ভয়াবহ ক্ষতির নজির আছে
উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক দূষণ নতুন নয়। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান কেন্দ্রের গবেষক ফারেস আল-মোমানি ও পন্নুমনি ভেথামনি জানিয়েছেন, ১৯৮০-এর দশক থেকেই উপসাগর দীর্ঘস্থায়ী তেলদূষণের চাপ বহন করছে।
দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে উপকূলজুড়ে লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল উত্তোলন প্ল্যাটফর্ম, শোধনাগারসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
সূত্র: আলজাজিরা