নাগরিক সমস্যা সমাধানে ৩৬০ ডিগ্রি সমন্বিত উদ্যোগের কথা বললেন মাহ্দী আমিন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে সরকার ৩৬০ ডিগ্রি সমন্বিত বা হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেছেন, একটি শহরের সমস্যা শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা সংস্থার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। আবাসন, যোগাযোগ, পানি, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান—সব বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল আরবান ফোরাম-২০২৬: ফ্রম পলিসি টু অ্যাকশন’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের শহরগুলো জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের মোট জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে নগর অঞ্চল থেকে, যেখানে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করেন। তবে অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়নের কারণে আবাসন, গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, সরকার শুধু বড় বড় ভবন বা প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণকে নগর উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে দেখতে চায় না। বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হলো এবং নাগরিক সুবিধা কতটা সহজলভ্য হলো, সেটিই হবে উন্নয়নের প্রকৃত সূচক।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতের শহর হতে হবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব। এমন নগরব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, আধুনিক গণপরিবহন এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সব নাগরিক সমানভাবে পাবেন।
তিনি আরও বলেন, ভালো নীতিমালা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন। এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি খাত, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটি ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী সংকট নয়। জলবায়ুর প্রভাব ইতোমধ্যে মানুষের জীবন, জীবিকা ও অবকাঠামোর ওপর পড়ছে। তাই নগর পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
খাল-বিল, নদী-নালা, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকাকে নগর পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান ব্যবহার করে জলাবদ্ধতা, তাপদাহ ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হবে।
নীতিনির্ধারণে সাধারণ নাগরিকদের মতামতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাকে পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে। তৃণমূলের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়েই কার্যকর নগর নীতি তৈরি করা সম্ভব।
মাহ্দী আমিন বলেন, ভবিষ্যতের শহর হবে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র। সেখানে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। মূল শহরের সঙ্গে আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বাড়িয়ে উন্নয়নের সুফল দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তি নাগরিক সেবাকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর শহর গড়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে শহরটি যেন মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থেই মানবিক ও বাসযোগ্য হয়।
তিনি বলেন, নগর সমস্যাগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক হলেও সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার দৃঢ়। বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক শহর গড়ে তুলতে সরকার কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।