ছয় মাসেই মন্ত্রিসভা ৫২ জনের, উপদেষ্টা-সহ সংখ্যা ৬৪ ছাড়াল

 প্রকাশ: ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ছয় মাসেই মন্ত্রিসভা ৫২ জনের, উপদেষ্টা-সহ সংখ্যা ৬৪ ছাড়াল

সফি রহমান: 

সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় আবারও সম্প্রসারণ ঘটল। নতুন করে চারজন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়ায় মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা এখন ৫২। গতকাল শুক্রবার বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার পর তাদের মধ্যে দায়িত্বও বণ্টন করা হয়েছে।

নতুন নিয়োগের ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর দেশের তৃতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভায় পরিণত হয়েছে বর্তমান সরকার। তবে চলতি সরকারের ছয় মাসের পথচলায় এরই মধ্যে মোট ৫৬ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বাইরে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সমমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা বর্তমানে ১২।

সুশাসনের জন্য নাগরিকসুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ছোট ও কার্যকর সরকার গঠনের কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, সরকার যত ছোট ও দক্ষ হবে, প্রশাসনিক কার্যক্রম তত বেশি গতিশীল হওয়ার সুযোগ থাকে। অতীতে বড় মন্ত্রিসভার সঙ্গে নানা ধরনের সমন্বয়হীনতাও দেখা গেছে।

ছয় নতুন মুখের দায়িত্ব

নতুন চার মন্ত্রী হলেন আব্দুল মঈন খান, এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাচিং প্রুজেরী ও আন্দালিব রহমান পার্থ। আর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।

এর মধ্যে রশিদুজ্জামান মিল্লাত আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এবার তিনি পূর্ণ মন্ত্রী হলেন। হুমায়ুন কবিরও আগে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দুল মঈন খান। রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

এদিকে এ মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রুজেরী এখন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। অন্যদিকে বিজেপি চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আগের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করলে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ৫১-তে নেমে আসবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।

শুরুতে ছিল ৫০ জন

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হয়। সেদিন প্রধানমন্ত্রীসহ ২৬ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। অর্থাৎ শুরুতেই মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়ায় ৫০ জনে।

এরপর স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। ডেপুটি স্পিকার হওয়ায় কায়সার কামালও প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান। তাদের জায়গায় নতুন করে আজম খান মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন।

পরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। এসব পরিবর্তনের পর শুক্রবার নতুন ছয়জন শপথ নেওয়ায় মন্ত্রিসভার বর্তমান সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে।

উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীও বাড়ছে

সরকারের শুরুতেই মন্ত্রী পদমর্যাদায় পাঁচজন এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় আরও পাঁচজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আরও তিনজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ পান।

তবে হুমায়ুন কবির উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় ওই তালিকায় একজন কমেছে। বর্তমানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সমমর্যাদায় উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী রয়েছেন ১২ জন। জহির উদ্দিন স্বপন আনুষ্ঠানিকভাবে উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলে এই সংখ্যা আবার ১৩ হবে।

অতীতে আরও বড় মন্ত্রিসভা হয়েছে

বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভার রেকর্ড এখনো শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সরকারের। ২০০৯ সালে গঠিত ওই সরকারের একপর্যায়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা ৬১-তে পৌঁছেছিল। উপদেষ্টাদের হিসাব ধরলে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সমমর্যাদায় দায়িত্ব পালনকারীর সংখ্যা ছিল আরও বেশি।

এর আগে ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকারও বড় মন্ত্রিসভার জন্য আলোচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ জন পূর্ণমন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী ও চারজন উপমন্ত্রী নিয়ে ওই সরকারের যাত্রা শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সমমর্যাদার উপদেষ্টা মিলিয়ে মোট ৬৪ জন দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালের মন্ত্রিসভা ছিল তুলনামূলক ছোট

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভায় ছিলেন ৩৪ জন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৪৫ জনে দাঁড়ায়।

পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন যুক্ত হওয়ায় পুরো মেয়াদে মোট ৫০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকারও তুলনামূলক ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীসহ প্রথম দফায় ২৯ জন শপথ নেন। পরে ধাপে ধাপে নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে মন্ত্রিসভার আকার ৪৯ জনে পৌঁছায়। পুরো মেয়াদে মোট ৫১ জন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।

বড় মন্ত্রিসভার রেকর্ড শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সরকারের

২০০৯ সালে গঠিত শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সরকারই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভার রেকর্ড তৈরি করে। শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ ২৪ জন মন্ত্রী ও আটজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। পরে কয়েক দফায় নতুন সদস্য যোগ হওয়ায় ২০১২ সালে মন্ত্রিসভার আকার ৫৩ জনে দাঁড়ায়।

২০১৩ সালের শেষ দিকে আরও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের পর একপর্যায়ে সদস্যসংখ্যা ৬১-তে পৌঁছে। ওই সময় একই দিনে ৩২ জন পদত্যাগ করলেও বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সমমর্যাদায় উপদেষ্টাসহ সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকার শুরু হয় ৪৯ সদস্য নিয়ে। পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা ৫৪ জনে পৌঁছায়। মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সাতজন উপদেষ্টাও ছিলেন।

২০১৯ সালে গঠিত শেখ হাসিনার চতুর্থ সরকারে শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ ৪৮ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ছিলেন। মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তনের পর মোট ৫১ জন দায়িত্ব পালন করেন। ওই সরকারেও মন্ত্রী পদমর্যাদায় সাতজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন।

২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি গঠিত শেখ হাসিনার পঞ্চম মন্ত্রিসভায় শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ ২৬ জন মন্ত্রী ও ১১ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। একই বছরের মার্চে আরও সাতজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হলে মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়ায় ৪৪ জনে। মন্ত্রী পদমর্যাদায় তখনও প্রধানমন্ত্রীর সাতজন উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বর্তমান সরকারের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় নতুন করে ছয়জন যুক্ত হওয়ায় আবারও বড় মন্ত্রিসভার আলোচনা সামনে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু সদস্যসংখ্যা নয়, সরকারের কার্যকারিতা, দায়িত্বের সুষম বণ্টন এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতাই শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার সাফল্য নির্ধারণ করবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement