গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর ঐক্যের পথে লিবিয়া

 প্রকাশ: ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর ঐক্যের পথে লিবিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর লিবিয়ার বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষগুলো প্রথমবারের মতো ঐক্যের নতুন পথ খুঁজছে। দীর্ঘ সংঘাত, বিভক্ত প্রতিষ্ঠান ও বারবার নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর এবার অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এপ্রিল মাসে এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দুই আইনসভা ১৯০ বিলিয়ন দিনার, অর্থাৎ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজেটে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে হওয়া এই বাজেট দুই পক্ষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন দেশটির বিভাজনকে তুলে ধরে, তেমনি সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

২০১১ সালে গাদ্দাফিকে উৎখাতের পর থেকেই লিবিয়া প্রায় স্থায়ী সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। ওই বছর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। আগস্টে বিদ্রোহীরা ত্রিপোলির দিকে অভিযান শুরু করলে গাদ্দাফি রাজধানী ছেড়ে পালান এবং তাঁর ৪২ বছরের শাসনের পতন ঘটে।

বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নির্বাচিত সংসদ দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় থাকবে। ২০১২ সালের জুলাইয়ে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভোট দিয়ে সংসদ নির্বাচিত করেন। ১৯৬৪ সালের পর সেটিই ছিল দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের একমাত্র নজির।

সেই ঐক্য অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। ২০১৪ সালে গাদ্দাফির সাবেক জেনারেল খলিফা হাফতার বেনগাজিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। একই সময়ে তাঁর সমর্থক বাহিনী ত্রিপোলির সংসদে হামলা চালায়।

ওই বছরের জুনের নির্বাচনে নিবন্ধিত ১৫ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার ভোট দেন। কয়েকটি শহরে ভোটকেন্দ্রই খোলেনি। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিদায়ী সংসদ আপত্তি জানালে নতুন নির্বাচিত আইনপ্রণেতারা পূর্বাঞ্চলে চলে যান। হাফতারের বাহিনীর সমর্থনে সেখানকার তবরুকভিত্তিক সংসদ গড়ে ওঠে।

এরপর দেশটিতে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৫ সালের জাতিসংঘের শান্তি চুক্তিতে দুই সংসদকে বিলুপ্ত না করে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি করা হয়। সে বছর গঠিত হয় গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড, যা জাতিসংঘের স্বীকৃত একমাত্র সরকার হিসেবে দায়িত্ব নেয়।

তবে সংঘাত থামেনি। ২০১৯ সালে হাফতার-সমর্থিত বাহিনী ত্রিপোলি দখলের অভিযান শুরু করলে আবারও বড় ধরনের লড়াই হয়। ২০২০ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত সংঘাত চলতে থাকে।

২০২১ সালে জাতিসংঘের আরেকটি উদ্যোগে আবদুল হামিদ দবেইবাহকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী করা হয়। শর্ত ছিল, ওই বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হবে এবং দবেইবাহ প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হলেও নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে তা বাতিল করে দেন দেশটির নির্বাচনপ্রধান। দবেইবাহ প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।

পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সংসদই নির্বাচনী আইন প্রণয়ন করে। ২০২২ সাল থেকে তারা দবেইবাহর সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি প্রশাসনকে সমর্থন করছে। সব পক্ষই প্রকাশ্যে নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও কোন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, ভোট কীভাবে হবে এবং পরবর্তী সরকারের ক্ষমতা কতটা হবে—এসব বিষয়েই মূল বিরোধ।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনার চেষ্টা করেছে। তবে সেই প্রচেষ্টাও অচলাবস্থায় আটকে আছে।

রাজনীতিতে অচলাবস্থা, তবু সামরিক সহযোগিতা

রাজনৈতিক আলোচনা চললেও পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলোর সামনের সারির অবস্থান খুব একটা বদলায়নি। তবে এপ্রিলে এক দশকের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো দুই পক্ষের সেনারা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয়।

সির্তে শহরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আয়োজিত একটি সামরিক মহড়ায় এই প্রশিক্ষণ হয়। এলাকাটি দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতির রেখার কাছাকাছি। মহড়ায় হাফতারের ছেলে ও প্রভাবশালী নেতা সাদ্দাম হাফতার উপস্থিত ছিলেন। ত্রিপোলির উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল সালাম জুবিও এই উদ্যোগকে সমর্থন করেন।

তবে দুই পক্ষের ভেতরের সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি। গত বছর ত্রিপোলিতে নিজের পক্ষের কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকের সময় আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা পদে থাকা মিলিশিয়া নেতা আবদুল গনি আল-কিকলি, যিনি ঘনেওয়া নামে পরিচিত, হত্যার শিকার হন।

গত সপ্তাহে বেনগাজিতে হাফতারের সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান ফাওজি আল-মানসুরি গাড়িতে লাগানো বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। দুই হত্যাকাণ্ডের কোনোটির দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে বড় সংঘাত কমার পাশাপাশি দুই শিবিরের ভেতরেই সহিংসতা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে।

তেল নিয়ে সংঘাত থেকে দর-কষাকষি

২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়ার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তেল রপ্তানি বারবার ব্যাহত হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে বন্দর ও তেলক্ষেত্র বন্ধ করে দিয়েছে।

লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, তিন বছর ধরে তেল অবকাঠামো বন্ধ থাকায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি। ২০২০ সালে হাফতারের তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল অবরোধে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। ২০২২ ও ২০২৪ সালেও তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধের ঘটনা ঘটে।

এ ধরনের অর্থনৈতিক সংঘাত এখন অনেকটাই কমেছে। আবুধাবিতে লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে হওয়া এক সমঝোতার মাধ্যমে আর্কেনু নামের একটি বেসরকারি কোম্পানি প্রথমবারের মতো লিবিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। পরে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা কোম্পানিটির মালিকানা ও রাজস্ব প্রবাহ নিয়ে প্রশ্ন তুললে এ বছর সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে ওই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, দুই পক্ষ নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ চিহ্নিত করে তেল রপ্তানি সচল রাখতে পারে। রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরিতে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও লিবিয়া খুব সামান্য অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। দেশটির সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারটি ২০১৩ সাল থেকে বন্ধ। ফলে আন্তর্জাতিক দামে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে লিবিয়াকে আবার পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়।

দেশের ভেতরে সেই জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে লিটারপ্রতি মাত্র কয়েক সেন্টে বিক্রি করা হয়। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচার অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি লিবিয়ার বড় অংশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এতে পানি সরবরাহ, ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং রাজধানী ত্রিপোলিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১১ সালে এক ডলারের বিপরীতে ১ দশমিক ৩ দিনারে লেনদেন করা হলেও চলতি মাসে সমান্তরাল বাজারে ডলারের দাম ৯ দিনারের বেশি হয়েছে। এতে সাধারণ পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।

গাদ্দাফি-পরবর্তী রূপান্তরের জন্য তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে। বিপ্লবীরা নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারগুলো নির্ধারিত সময়ের পরও টিকে গেছে, আর তেল অবরোধ শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনার পথ খুলেছে।

লিবিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে অর্থনৈতিক বিষয়ে দর-কষাকষির অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। তিনটি যুদ্ধের পর সাধারণ লিবীয়দের বড় অংশই আরেকটি যুদ্ধ চায় না।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, অর্থনীতি নিয়ে যে সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছে, তা কি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব হবে?

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement