খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস ও কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর
ঢাকা, ১৫ শ্রাবণ (৩০ জুলাই):
দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার (লজিস্টিক) ব্যয় কমানো, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর মতে, খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজারব্যবস্থার অসঙ্গতি দূর করার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাজারব্যবস্থা, মুনাফার মার্জিন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, অতিরিক্ত তারল্য এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছিল। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তিনি জানান, বিশ্বে যেখানে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয়ে ব্যয় হয়, সেখানে বাংলাদেশে এই হার প্রায় ১৬ শতাংশ। এই ব্যয় কমানো সম্ভব হলে খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাজারসংক্রান্ত সঠিক তথ্যের অভাবে কৃষকরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক বছর ধরে আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলেও অনেক কৃষক একই মাত্রায় উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। এটি বাজার তথ্য ও উৎপাদন পরিকল্পনায় ঘাটতিরই প্রতিফলন।
তিনি আরও জানান, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন স্তরে অস্বাভাবিক ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাজারে অনানুষ্ঠানিক ব্যয় কমানোর দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ কৃষক পরিবার সীমিত আয়ে জীবনযাপন করে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত কৃষি উপকরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। এ বাস্তবতায় কৃষিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি খাতে ভর্তুকি, উন্নত বীজ, সার ও সেচ সুবিধার মাধ্যমে সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মাটি, জলবায়ু ও কৃষির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষি এমন একটি খাত, যা শিল্পের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয় না; বরং প্রকৃতি ও নানা ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল। তাই জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে—লজিস্টিক ব্যয় কমানো, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। উৎপাদনশীলতা বাড়লে কৃষকের আয় বাড়বে, একই সঙ্গে সাধারণ ভোক্তাও সহনীয় দামে খাদ্যপণ্য পাবে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডল, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল মাজিদ এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা।