পদ্মার পানি কমায় সংকটে জিকে সেচ প্রকল্প, টিকিয়ে রাখতে ১২০০ কোটি টাকার উদ্যোগ
কুষ্টিয়া
প্রতিনিধি:
দেশের প্রথম এবং অন্যতম
বৃহৎ আধুনিক সেচ ব্যবস্থা গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।
উজানে পানি প্রত্যাহার এবং শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর ক্রমহ্রাসমান প্রবাহের কারণে প্রকল্পটির
পানি উত্তোলন কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১২০০ কোটি
টাকা ব্যয়ে পাম্পিং ব্যবস্থার ব্যাপক পুনর্গঠন কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জিকে সেচ প্রকল্পের
মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি তুলে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ
ও মাগুরা জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয়। প্রায় ১৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল
নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চার জেলার ১৩টি উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর এলাকায়
সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে ধান চাষ সম্প্রসারণে
প্রকল্পটির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬২ সালে চালু হওয়া
এই প্রকল্প একসময় প্রায় ৯৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করত। তবে অবকাঠামোর বার্ধক্য,
খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, পলি জমা এবং একাধিক পাম্প অচল হয়ে পড়ার কারণে বর্তমানে কার্যকর
সেচ এলাকা কমে প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে।
জিকে প্রকল্পের পাম্প
হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে পাম্প সচল রাখতে ইনটেক চ্যানেলে
কমপক্ষে ৩ দশমিক ৯ মিটার পানির স্তর প্রয়োজন হয়। পুনর্গঠন প্রকল্পের আওতায় এই সীমা
কমিয়ে ২ দশমিক ৫ মিটারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ সম্পন্ন
হলে নদীর পানি অনেক নিচে নেমে গেলেও পাম্প পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামোগত
উন্নয়নই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যদি উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ না আসে, তাহলে
পানির স্তর কমিয়ে আনার সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের
মতে, ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহে
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। নদীর পানির স্তর ৪ দশমিক ৫ মিটারের নিচে নেমে গেলে
জিকে প্রকল্পের পাম্পিং কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।
এর বাস্তব প্রভাব দেখা
যায় ২০২৪ সালে। ওই সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পদ্মার পানির স্তর ৪ মিটারের নিচে নেমে
গেলে প্রকল্পের পানি উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রকল্প এলাকার হাজারো কৃষক
সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
এদিকে আন্তর্জাতিক
ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান সম্প্রতি কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী সফরকালে
বলেন, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর
আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব না হলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে,
এমনকি জাতিসংঘেও উত্থাপনের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিকে প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়, আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।