বাজেটের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, সংশয়ে অর্থনীতিবিদরা
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশ। কিন্তু দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই সংখ্যার দূরত্ব নিয়েই এখন সরব হয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস কী বলছে?
বিশ্বের প্রধান উন্নয়ন সংস্থাগুলোর হিসাব সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে—
আইএমএফ বলছে, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ব্যবসায়িক মন্দা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার চড়া থাকায় প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এডিবি-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৪.৭ শতাংশের কাছাকাছি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে ধীরগতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা।
বিশ্বব্যাংক এ বছরের শুরুতে প্রকাশিত 'গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস' প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.৬ এবং আগামী অর্থবছরে ৬.১ শতাংশ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সংস্থাটি শিগগিরই তাদের প্রক্ষেপণ সংশোধন করবে এবং সেটি ৪ শতাংশের ঘরেই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, লক্ষ্যমাত্রাটি নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। তিনি স্পষ্ট করেন, বাজেট বাস্তবায়নে যথেষ্ট শক্তি না থাকলে এই প্রবৃদ্ধি ছোঁয়া যাবে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের উপরে, বিনিয়োগ নিম্নমুখী এবং সংস্কারের গতি সীমিত। এই পরিস্থিতিতে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে তিনি 'অত্যন্ত আশাবাদী' বলে মন্তব্য করেছেন।
গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলছে, গত অর্থবছরের রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ না হওয়া থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বাস্তবনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি।
বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের হিসেবে বড় ফাঁক
বাজেটের খসড়ায় আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে জিডিপির ৩১.৪০ শতাংশ — যার মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে ২৪.৯০ এবং সরকারি খাত থেকে ৬.৫০ শতাংশ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে বর্তমান বিনিয়োগের হার মাত্র ২৮.৫৪ শতাংশ। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার — যা এখন জিডিপির মাত্র ২১.৯৮ শতাংশে নেমে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে মানুষ সঞ্চয় ছেঁটে ব্যয় মেটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ লক্ষ্য পূরণে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই — যা বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় মোটেও সহজ নয়।
মূল্যস্ফীতিতেও চ্যালেঞ্জ
সরকার আগামী বছর মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ডলারের বিপরীতে টাকার দুর্বলতার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে সরবরাহ চেইনে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামানো কঠিন হবে।
শিল্প খাতেও শঙ্কা
ব্যবসায়ী নেতারা জানাচ্ছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে বহু কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। তার ওপর চড়া সুদের হারে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দ্বৈত সংকটে বেসরকারি খাতের প্রসার থমকে গেলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা লাখো তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না, এবং সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হবে।
করণীয় কী?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কাগজে বড় সংখ্যা লিখলেই অর্থনীতি সচল হয় না। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা বছরের মাঝপথে এসে পুরো পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। তাই আসন্ন বাজেটে বড় সংখ্যার চেয়ে জরুরি হলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, ডলারের বাজার স্বাভাবিক করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।