গ্রেসি ম্যানশনে ট্রাম্প-মামদানি, প্রশংসায় অবাক রাজনৈতিক মহল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার আবারও মুখোমুখি বসলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে নিউইয়র্কে মেয়রের সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশনে প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠকে আবাসন, অভিবাসন থেকে শুরু করে ঘরের সাজসজ্জা-বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তাঁরা। বৈঠক শেষে দুজনই একে অপরের প্রশংসা করেন।
মামদানি ও ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎ এক বছরেরও কম সময়ে তাঁদের তৃতীয় বৈঠক। একসময় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মামদানি মেয়র হওয়ার পর তাঁর সমালোচনার সুর অনেকটাই নরম করেছেন।
গ্রেসি ম্যানশনের লনে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নিউইয়র্কের জন্য যা ভালো, দেশের জন্য যা ভালো, সেটাই চাই। তাই আমার সামনে যদি এমন একজন মেয়র বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে, যিনি খারাপ বা ভয়াবহ মেয়র হবেন-আমি সেটা চাই না। আমি চাই তিনি একজন দুর্দান্ত মেয়র হন। তাঁর সেই সম্ভাবনা আছে, অনেক সম্ভাবনা আছে।’
এ কথা বলার সময় ট্রাম্প মামদানির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর পিঠে হাতও চাপড়ে দেন।জবাবে মামদানি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান কুইন্সের পুরোনো রেলইয়ার্ডের ওপর ১২ হাজারের বেশি আবাসন নির্মাণের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থায়ন নিয়ে আলোচনাকে ‘নতুন পর্যায়ে’ নেওয়ার আগ্রহ দেখানোর জন্য।
মামদানি বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের আগ্রহকে আমি স্বাগত জানাই। আমরা তাঁকে শুধু দেশের নেতা হিসেবে জানি না, আমাদের এই শহরে অনেক আবাসন নির্মাণ করেছেন-এমন একজন হিসেবেও জানি।’
তবে তাঁদের বৈঠকের নিচে চাপা পড়ে থাকেনি বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্যগুলোও। নিউইয়র্কে থাকা বিভিন্ন অভিবাসী গোষ্ঠীর সাময়িক সুরক্ষা মর্যাদা বা টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে হাইতিয়ান অভিবাসীদের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
ট্রাম্প বলেন, ‘মেয়র এ বিষয়ে খুবই দৃঢ় অবস্থানে আছেন, সেটা আমি বলতে পারি। তিনি বিষয়টি তুলেছেনও।’
অভিবাসন আইন প্রয়োগের প্রশ্নে অবশ্য দুজনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিউইয়র্কে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর (ICE) গ্রেপ্তার বাড়তে থাকায় মামদানি বারবার সমালোচনা করেছেন। তবে অনেক সময়ই তিনি সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি।
গণমাধ্যম নিয়েও তাঁদের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। হোয়াইট হাউসে পলিটিকো, সিএনএন ও এমএস নাওসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে মামদানি বলেন, তাঁর অনুষ্ঠানে সব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকার সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছি, এখানে লনে সংবাদমাধ্যমের সব সদস্য থাকবেন। আর আমি এটাই বিশ্বাস করি।’
এরপর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভুয়া খবর’কে হোয়াইট হাউস থেকে দূরে রাখার ‘দায়িত্ব’ তাঁর আছে। এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পলিটিকো, সিএনএন ও এমএস নাও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
মামদানির অনুরোধেই বৈঠকটি আয়োজন করা হয়। এতে দুই নেতার চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস ও এল বিসগার্ড-চার্চও অংশ নেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা থাকায় ট্রাম্প বৈঠকের জন্য আগেভাগেই নিউইয়র্কে পৌঁছান।
কুইন্সে ১২ হাজার আবাসনের পরিকল্পনা
ট্রাম্পের সঙ্গে আগের দুই বৈঠকেই মামদানি কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ড নামের বিশাল রেল ডিপোর ওপর আবাসন নির্মাণের বিষয়টি তুলেছিলেন। সোমবারের বৈঠকে সেই পরিকল্পনাকে ধারণাগত আলোচনা থেকে বাস্তবায়নের কারিগরি পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে দুজন একমত হয়েছেন বলে জানান মেয়র।
এখন নিউইয়র্কের আবাসন বিভাগ ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে এ প্রকল্প নিয়ে কারিগরি আলোচনা হবে।
রেলইয়ার্ডের ওপর আবাসন নির্মাণের স্বপ্ন নিউইয়র্কের একাধিক প্রজন্মের মেয়র দেখে আসছেন। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে জটিল মালিকানা কাঠামো সামলানোর পাশাপাশি রেললাইনের ওপর কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করতে হবে।
মামদানি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছি, যা আমাদের শহরে খুবই বিরল-একটি সম্পূর্ণ নতুন পাড়া গড়ে তোলার সম্ভাবনা। আর এটা সম্ভব হবে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের অংশীদারত্বে। কারণ শুধু প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণই বড় নয়, এমন একটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের অনুমোদনও প্রয়োজন, যা প্রায় ১২ হাজার বাড়ি এবং প্রায় ৩০ হাজার কর্মসংস্থানের ভিত্তি হবে।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে মামদানির জন্য ব্যস্ত একটি সপ্তাহ শুরু হয়েছে। তিনি নরওয়ে, ব্রাজিল ও স্পেনের বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বা বৈঠকের পরিকল্পনা করছেন। সপ্তাহান্তে টরন্টো, মেক্সিকো সিটি ও আমস্টারডামের মেয়রসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদেরও আতিথ্য দিয়েছেন তিনি।
সোমবার রাতে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর মামদানির ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে একটি নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ওই বৈঠকে স্যান্ডার্সের সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী মাহমুদ খলিলও থাকার কথা ছিল। জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে খলিল তখন নিউইয়র্কে ছিলেন।
আন্তর্জাতিক বামপন্থী রাজনীতির নেতাদের সঙ্গে এসব বৈঠক মামদানির রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্ত করার সুযোগ তৈরি করলেও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
প্রায় এক বছর আগে হোয়াইট হাউসে তাঁদের প্রথম বৈঠকটি অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থেকেছেন মামদানি। তিনি খুব কমই সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা করেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকেও বিরত থাকেন। এমনকি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কত ঘন ঘন এবং কী বিষয়ে তাঁর কথা হয়, সেটিও সাধারণত প্রকাশ করেন না।
মামদানির এই কৌশল নিয়ে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে একটি ব্যাখ্যা রয়েছে-ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চললে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপের ঝুঁকি কমে, যা শহরগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাপক ক্ষমতার কারণে নিউইয়র্কবাসীর দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটি শাখার সহসভাপতি গ্রেস মাউসার বলেন, সংগঠনের বেশির ভাগ মানুষই এটিকে কৌশল হিসেবে দেখেন। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প ‘খুব সংবেদনশীল এবং সহজেই ক্ষুব্ধ হন’ এবং তাঁকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে হলে তিনি অনির্দেশ্যভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
মাউসার বলেন, ‘সরাসরি তাঁকে অপমান করা শুধু জোহরানের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, পুরো শহরের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।’
তবে মামদানির এই সমঝোতার পথ তাঁর নিজ দলের আদর্শগত অবস্থানের সঙ্গে ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখলে নিউইয়র্কে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন কর্মকর্তাদের বড় ধরনের অভিযান ঠেকানো বা কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু মামদানি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার নয় মাস পর নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোতেই আইসিইর গ্রেপ্তার অভিযান বেড়েছে।
এর পাশাপাশি বামপন্থীদের আপত্তির কারণ হতে পারে-এমন আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের কাছে সাম্প্রতিক অস্ত্র বিক্রি, এমন এক সময়ে যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধটি মামদানির সমর্থকদের কাছে অন্যতম প্রধান ইস্যু।
দেশজুড়েও ডেমোক্র্যাটরা ক্রমেই আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়া ও প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থাকা নেতাদের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
মাউসার বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপ হলে বা পরিবর্তন এলে মেয়রের রাজনৈতিক হিসাবও বদলাবে বলে আমি মনে করি।’ তিনি জানান, মামদানির দল ডিএসএ এবং অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে সেই পরিবর্তনের সীমা কোথায় গিয়ে নির্ধারিত হবে, তা তিনি জানেন না।
সম্পর্ক রাখার বাস্তব সুবিধাও দেখালেন মামদানি
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বাস্তব সুবিধার একটি উদাহরণও দেন মামদানি।
তিনি জানান, ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে তাঁদের সর্বশেষ বৈঠকের পর ট্রাম্প তাঁকে ফোন করে সানিসাইড ইয়ার্ড প্রকল্প নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেন। পরে মামদানি প্রেসিডেন্টের কাছে যে নামের তালিকা দিয়েছিলেন, সেখান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন হেফাজতে থাকা দুই শিক্ষার্থীকে মুক্তিও দেওয়া হয়।
মামদানি বলেন, ‘একটি বৈঠক যদি কাউকে আটক থাকার অবস্থা থেকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ এনে দিতে পারে, তাহলে সেই বৈঠকে বসা সার্থক। একই সঙ্গে আমাদের যে মতপার্থক্য আছে, সে বিষয়ে সৎ থাকাও জরুরি।’
তবে দুই নেতার বৈঠক নিয়ে তাঁদের নিজ নিজ দলের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা গেছে। রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার লরা লুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন।
মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের কেউ কেউ মামদানির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে প্রকাশ্য বিরোধিতা না থাকায় হতাশা জানিয়েছেন। গত মাসে হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করায় যে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, মামদানির ক্ষেত্রে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। অবশ্য কুশনার একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা, আর ট্রাম্প বর্তমানে প্রেসিডেন্ট-দুই বৈঠকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়।
জেফরিসের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কুশনারের সঙ্গে দেখা করার কারণে জেফরিসকে যারা আক্রমণ করেছিলেন, এই সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির বৈঠক নিয়ে তাঁরাই নীরব।’
সব সমালোচনার মধ্যেও গ্রেসি ম্যানশনে ট্রাম্প-মামদানির অপ্রত্যাশিত সৌহার্দ্য শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গাতেও গড়িয়েছে। মামদানির ঘর সাজানোর রুচির প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, গ্রেসি ম্যানশনকে তাঁর কাছে ‘একটি বাড়ির মতো’ মনে হয়েছে এবং জায়গাটি ‘সুন্দর’।
সূত্র: পলিটিকো