বার্লিনে বামপন্থীদের জয়, অভিবাসী মহলে নতুন আশার আলো
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বামপন্থী দল ডি লিংকে। তুর্কি বংশোদ্ভূত এলিফ এরাল্পের নেতৃত্বে দলটির এই সাফল্য অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এর বিপরীতে দেশটির পূর্বাঞ্চলে অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির সমর্থনও বেড়েছে।
রোববারের নির্বাচনের পরের সকালটা ছিল ঠান্ডা ও মেঘলা। কিন্তু বার্লিনের ব্যস্ত নয়ক্যোলন এলাকার ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সুমেইয়া স্কেভার কাছে শহরটির ভবিষ্যৎ যেন বেশ উজ্জ্বল।
এই প্রথম ভোট দিয়েছেন স্কেভা। অভিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে কাবাবের গন্ধ ভেসে আসছিল। তিনি বলেন, “আমি চাই তারা ধনীদের ওপর কর বাড়াক এবং সবার জন্য আরও সুযোগ তৈরি করুক।”
বার্লিনের নির্বাচনে ডি লিংকের জয় দলটির জন্য নজিরবিহীন। এত দিন দলটিকে পুঁজিবাদবিরোধী ও অভিবাসনপন্থী অবস্থানের কারণে জার্মান রাজনীতির একটি কট্টর বামপন্থী শক্তি হিসেবে দেখা হতো। এবার দলটি ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে-বার্লিনে দলটির ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ ফল।
৪৫ বছর বয়সী এরাল্প তুর্কি অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এই ফল ধরে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তিনি বার্লিনের প্রথম ডি লিংকে মেয়র এবং অভিবাসী পরিবারের প্রথম নারী গভর্নিং মেয়র হতে পারেন।
দলের এই সাফল্যে অভিবাসনপন্থী বার্লিনবাসীদের অনেকেই স্বস্তি পেয়েছেন। একই সময়ে জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এএফডির সমর্থন বাড়তে থাকায় তাঁদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও ডি লিংকের সমর্থন ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সাশ্রয়ী জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতিতে ৩০ বছরের কম বয়সী অনেক ভোটার দলটির দিকে ঝুঁকেছেন।
বাড়িভাড়া কমানোর প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনী প্রচারে এরাল্পের প্রধান বিষয় ছিল আবাসন সংকট ও বাড়িভাড়া। দ্রুত সম্প্রসারিত বার্লিনে ভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং বাসস্থানের সংকট মোকাবিলায় তিনি ভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর গলায় ঝোলানো সোনার হারেও ‘রেন্ট ক্যাপ’ বা ভাড়া নিয়ন্ত্রণের কথাটি লেখা ছিল।
বড় করপোরেট মালিকানাধীন আবাসন থেকে কিছু বাড়ি অধিগ্রহণের পরিকল্পনাও তাঁর দলের রয়েছে। এর পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন এলাকাগুলো পরিষ্কার করা, গৃহহীনদের মতো ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সামাজিক ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্থানীয় নির্বাচনে অ-নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এরাল্প।
২৬ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী মাইকেল আকান বার্লিনের বৈচিত্র্যময় শ্রমজীবী এলাকা ভেডিংয়ের বাসিন্দা। তিনি ডি লিংকের ভোটার। আকান বলেন, “তারা যেসব নতুন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবে দেখতে ভালো লাগবে। বেশি বাড়িভাড়া আমার জন্য সমস্যা। গ্যাসের দামও সমস্যা।”
তবে রাজ্য সরকার গ্যাস বা অন্যান্য পণ্যের বাজারদর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডি লিংকের অনেক সমর্থকের মতো আকানও মনে করেন, এরাল্পের নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
বার্লিনে ডি লিংকে পেয়েছে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। এর পর CDU পেয়েছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, এএফডি ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, গ্রিনস ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং SPD ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনের আগে পরিচালিত জেডডিএফের একটি জরিপে মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে এরাল্পের ব্যক্তিগত সমর্থন ছিল ৩৬ শতাংশ।
অভিবাসনবিরোধী এএফডিরও উত্থান
বার্লিনের প্রায় ৩৬ লাখ বাসিন্দার প্রায় অর্ধেকেরই অভিবাসী পরিবারের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় তুর্কি বংশোদ্ভূতরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির পুনর্গঠনে তুরস্ক থেকে আসা শ্রমিকদের বড় ভূমিকা ছিল। বার্লিনে আরব জনগোষ্ঠীরও বড় উপস্থিতি রয়েছে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফিলিস্তিনি প্রবাসী সম্প্রদায়গুলোর একটি এই শহরেই রয়েছে।
বার্লিনে ডি লিংকের সমর্থকেরা যখন বিজয় উদ্যাপন করছেন, তখন অভিবাসনবিরোধী এএফডিও নির্বাচনে নিজেদের সমর্থন বাড়িয়েছে। দলটি বার্লিনে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছে-যা রাজধানীতে দলটির সর্বোচ্চ ফল। একই দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনেও এএফডি জয় পায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি ছিল দলটির দ্বিতীয় রাজ্য নির্বাচনে জয়।
এই পরিস্থিতিতে নয়ক্যোলনের প্রান্তে ছোট বইয়ের দোকান বার্টলবি অ্যান্ড কোম্পানি চালানো আনা এস পারেহার কাছে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের যোগ্য ভোটারদের জন্য তিনি নিজের দোকানে ভোট দেওয়ার কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন। নির্বাচনের আগে নিজের পরিচিতদেরও এরাল্পকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পারেহা বলেন, “আমরা এমন একজন নারীকে পাব, যার অভিবাসী পটভূমি রয়েছে এবং যিনি আমাদের মতো।”
তিনি বলেন, “তাৎক্ষণিকভাবে কী পরিবর্তন হবে, আমরা জানি না। কিন্তু ভাড়া থেকে শুরু করে ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা এবং যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা সবচেয়ে কঠিন-সব ক্ষেত্রেই এলিফ এরাল্পের প্রতিটি প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ।”
এখানে ‘যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা কঠিন’ বলতে তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির কথা বোঝান।
ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলা এখনও স্পর্শকাতর
জার্মানিতে ফিলিস্তিনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দেখানো এখনো অনেকটাই স্পর্শকাতর বিষয়। দেশটির কঠোর ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে পুলিশের অভিযান হয়েছে, এমনকি কয়েকটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছর জার্মানি বামপন্থী চরমপন্থার অভিযোগে ফিলিস্তিনপন্থী তিনটি বইয়ের দোকানের কাছ থেকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পুরস্কার প্রত্যাহার করে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় চলমান যুদ্ধ নিয়ে আরও জোরালো অবস্থান না নেওয়া এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট নীতি না দেওয়ার জন্য এরাল্প সমালোচিত হয়েছেন। তবে তিনি বারবার বলেছেন, ফিলিস্তিনি, ইহুদি এবং অন্যান্য ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তার পক্ষে তিনি অবস্থান করেন।
তাঁর সমর্থকদের আশা, অন্তত বার্লিন রাজ্য সরকার ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠগুলোর ওপর চলমান চাপ বন্ধ করবে।
সামনে কঠিন জোট আলোচনা
নির্বাচনে জয় পেলেও এরাল্পের সামনে এখনো বড় রাজনৈতিক কাজ বাকি। ডি লিংকের এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে সরকার গঠন করতে হলে অন্য দলের সঙ্গে জোট করতে হবে।
সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হিসেবে সাবেক ক্ষমতাসীন জোটের দুই দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এসপিডি এবং রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউর নাম সামনে এসেছে। তবে এরাল্পের নীতির বেশ কিছু অংশ নিয়ে এরই মধ্যে দুই দল আপত্তি জানিয়েছে।
বিশেষ করে বড় আবাসন কোম্পানির মালিকানাধীন বাড়ি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। ফলে ডি লিংকেকে জোট গঠনের জন্য অন্য দলগুলোকে রাজি করাতে হবে। দলটির কিছু সমর্থক আশঙ্কা করছেন, এর বিনিময়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিতে বড় ধরনের সমঝোতা করতে হতে পারে।
এই জোট আলোচনা শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।
তবে আপাতত বার্লিনের কিছু বাসিন্দা জয়ের আনন্দেই আছেন। দেশজুড়ে ডানপন্থীদের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে তাঁদের কাছে এই ফলটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার একটি সুযোগ।
বইয়ের দোকানটির মালিক পারেহা বলেন, “প্রথম পরিবর্তনটা প্রতীকী। মানুষের হারিয়ে যাওয়া আশা ও আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য সেটি গুরুত্বপূর্ণ।”
সূত্র: আলজাজিরা