সংবাদ শিরোনাম

যুদ্ধের ধাক্কায় বসরায় তেলকর্মীরা বেকার, বন্দরে থমকে বাণিজ্য

 প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের ধাক্কায় বসরায় তেলকর্মীরা বেকার, বন্দরে থমকে বাণিজ্য ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরাকের তেলসমৃদ্ধ শহর বসরায় এখন কাজের অপেক্ষায় দিন কাটছে রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার ফাওজির। আগে যেখানে নিয়মিত কাজের চাপ ছিল, সেখানে এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও কাজ মিলছে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ একসময় ব্যস্ত এই বন্দরনগরীর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে।


ফাওজি এএফপিকে বলেন, “এক মাস ধরে আমি কোনো কাজই করিনি। আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করব কীসের?”

বসরার অনেক বাসিন্দা চাকরি হারিয়েছেন। কেউ কেউ আবার বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও বড় ধরনের বেতন কাটার মুখে পড়েছেন। তেলক্ষেত্রগুলোতে কার্যক্রম কমে যাওয়ার পাশাপাশি উম্ম কাসর কার্গো বন্দরের কাজও সংকুচিত হয়েছে।

ইরাকের বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি থেকে। দেশটির একমাত্র উপসাগরীয় প্রবেশদ্বার বসরার আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা দিয়ে এর বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে বিদেশে যায়।

যুদ্ধ ইরাকের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং রপ্তানির প্রধান এই পথটির ওপর দেশটির নির্ভরতার চিত্র আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। কয়েক দশকের সংঘাতের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর যে চেষ্টা চলছিল, তাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে।

ফাওজি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রথমে কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ কমায়। পরে বেতন অর্ধেক করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েক ডজন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়। এখন তাঁকে মাসে মাত্র ১৫ দিন কাজে হাজির হতে হয়।

বসরার বিভিন্ন পার্কিং এলাকায় সারি সারি তেলবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ট্রাক একেবারেই খালি অবস্থায় পড়ে আছে। আবার কিছু ট্রাক তেলভর্তি ট্যাংক নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করছে, যাতে সেই অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা যায়।

সস্তায় তেল বিক্রি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করত। এর মধ্যে গড়ে ৩৪ লাখ ব্যারেল রপ্তানি হতো, যার বেশির ভাগই হরমুজ প্রণালি দিয়ে।

কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করার পর ইরাকের স্থলভিত্তিক তেল সংরক্ষণাগারগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়। একপর্যায়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয় দেশটি।

দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদেরা বলে আসছেন, জ্বালানি বাজারের ওঠানামার ধাক্কা সামলাতে ইরাকের আয়ের উৎসে বৈচিত্র্য আনা দরকার। কিন্তু দুর্বল বেসরকারি খাত, ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে সেই পরিবর্তন সহজ নয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরাক বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে সিরিয়া হয়ে ট্রাকে তেল পাঠানো এবং তুরস্কের দিকে একটি পাইপলাইন ব্যবহার করার উদ্যোগ রয়েছে। তবে সমুদ্রপথে যে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি হতো, এসব বিকল্প পথ তার সামান্য অংশই বহন করতে পারে।

সামুদ্রিক পণ্য পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বড় পতনের পর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হরমুজ দিয়ে ইরাকের তেল রপ্তানি আবার বাড়তে শুরু করে। তবে এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, এসব তেল “ছাড় দেওয়া দামে” বিক্রি করতে হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত ইরাক প্রতিদিন গড়ে ২৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।

আগস্টের শেষ দিকে ইরান ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ওমানের উপকূল ঘেঁষে নিরাপদ একটি হরমুজ করিডর ব্যবহার করে তারা সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

তারপরও অর্থনীতিতে এর ধাক্কা স্পষ্ট। পণ্যের দাম বেড়েছে, ওঠানামা করেছে ইরাকি দিনারের মূল্যও।

সরকারের এক কর্মকর্তা জানান, ইরাকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে।

তেল বিক্রি থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ইরাক ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়া, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং দিনারের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে এই অর্থ ব্যবহার করা হয়।

তেল থেকে আয় কমে যাওয়ায় সরকারকে দেশের ভেতর থেকেই ঋণ নিতে হয়েছে। সরকার আশা করছে, আরও কয়েক মাস এভাবে ঋণ নেওয়া সম্ভব হবে। তবে অর্থনীতিবিদ আলী আল-মাওলাউই বলেন, “সম্ভবত তারা বছরের শেষ হওয়ার আগেই সংঘাতের একটি সমাধান হবে-এমন প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করছে।”

সম্প্রতি তেল রপ্তানি আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সরকারকে “আরও একটু সময়” দিয়েছে। এর ফলে সামান্য দেরি হলেও সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

তবে এই অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেন, “এটা চালিয়ে যেতে পারাটাই এখন জরুরি।”

ফাঁকা পড়ে আছে বন্দরের জেটি
খাদ্য, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক গ্যাস পর্যন্ত ইরাকের অধিকাংশ পণ্যই আমদানি করা হয়। কিন্তু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বন্দর উম্ম কাসর এখন প্রায় জনশূন্য।

বন্দরের উত্তর অংশে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ ভিড়ে আছে। সেগুলোর মধ্যে একটি ইরানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ। আরেকটি জাহাজ সম্পর্কে বন্দরের কর্মীরা জানান, সেটি চীন থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে এসেছে।

সম্প্রতি নির্মিত তিনটি জেটিও পড়ে আছে খালি। সেগুলোর ক্রেন ও চলাচলের পথেও নেই কর্মচাঞ্চল্য।

এই মন্দার প্রভাব পড়েছে সরকারি বন্দরের কর্মীদের ওপরও। বন্দরের মুনাফার সঙ্গে যুক্ত মাসিক প্রণোদনা তারা হারিয়েছেন। ওই অর্থ তাঁদের মূল বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত আয় হিসেবে যোগ হতো।

বন্দরের উত্তরাঞ্চলের প্রধান ক্যাপ্টেন সালেম হুসেইন বলেন, “জাহাজ না এলে কোম্পানিগুলো একই সংখ্যক কর্মী ধরে রাখতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “হরমুজ আবার খুললেই প্রকৃত কাজ ফিরবে।”

বন্দরের এই স্থবিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বসরার স্থানীয় অর্থনীতিতেও।

৩৬ বছর বয়সী বসরার ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী জায়েদ হাদি বলেন, তাঁর বিক্রি অর্ধেকে নেমে গেছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়া, চাকরি হারানো এবং তেল খাতের বিদেশি কর্মীদের শহর ছেড়ে চলে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

হাদি বলেন, ক্রেতারা এখন কেনাকাটায় “দ্বিধা করছেন”, কারণ তাঁরা বেতন পেতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন এবং সামনে আরও কঠিন সময় আসতে পারে বলে ভয় পাচ্ছেন।

৩৫ বছর বয়সী আমির একটি তেলক্ষেত্রে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং কর্মীদের বেতন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।

আমিরের কথায়, “বসরায় আমরা বন্দর আর তেলের ওপর নির্ভর করি। এখন দুটিই থেমে গেছে।”
সূত্র: ডন