সংবাদ শিরোনাম

ট্রাম্পকে ঘিরে দ্বিধায় রিপাবলিকানরা, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন

 প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২০ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পকে ঘিরে দ্বিধায় রিপাবলিকানরা, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন ছবি-সংগৃহীত


আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছেন তাঁর দলেরই কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী ও আইনপ্রণেতা। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে নির্বাচনী লড়াই যত কঠিন হচ্ছে, ততই তাঁদের সামনে তৈরি হচ্ছে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমীকরণ-ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও দলীয় সমর্থনের ওপর নির্ভর করবেন, নাকি স্থানীয় ভোটারদের কাছে নিজেদের আলাদা অবস্থান তুলে ধরবেন। 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কয়েকজন রিপাবলিকান ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্যে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি, ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত, প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং ফেডারেল সংস্থাগুলোকে অন্টারিও হ্রদের নাম বদলে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দেওয়া নির্বাহী আদেশ।

ট্রাম্প অবশ্য নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে চাইছেন। তিনি রিপাবলিকানদের তাঁর এজেন্ডার ধারাবাহিকতা হিসেবে এবারের নির্বাচনকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। গত সপ্তাহের এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভান করুন, আমিও ব্যালটে আছি-কারণ মূলত আমিও আছি।’ তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে প্রার্থীরা এখন স্থানীয় ইস্যুকে সামনে আনছেন এবং প্রয়োজন মনে করলে হোয়াইট হাউস থেকেও নিজেদের কিছুটা আলাদা রাখছেন।

আইওয়ায় রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসন সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, তাঁর রাজ্যের মানুষ ‘চাপে পড়ছেন’ এবং ইরানের যুদ্ধের খরচ পেট্রল পাম্প কিংবা দোকানের কাউন্টারে তাঁদের বহন করা উচিত নয়। চলমান সামরিক অভিযান দ্রুত বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। 

হিনসনের বক্তব্যের আগে গত সপ্তাহে সাত রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার একটি ‘ওয়ার পাওয়ার্স’ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। তাঁদের মধ্যে আইওয়ার জ্যাক নান ও মারিয়েনেট মিলার-মিকস বিশেষভাবে নিজেদের এলাকার মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের কথা তুলে ধরেন।

মিলার-মিকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমি মার্চেই বলেছিলাম, অভিযানকে সীমিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে রাখতে হবে, কারণ আমেরিকানরা আরেকটি অনির্দিষ্ট যুদ্ধ চায় না। আইওয়ার মানুষ যখন পেট্রল কিনতে অতিরিক্ত দাম দিচ্ছেন, তখন আমাদের সেনাদের অনির্দিষ্ট যুদ্ধের মধ্যে রাখার পক্ষে আমি ভোট দেব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা ও তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেস ও আমেরিকান জনগণের সামনে এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তার একটি পরিকল্পনা দিতে হবে। যাতে আমরা আমাদের সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দাম কমানোর দিকে মন দিতে পারি।’

নানও একই সুরে কথা বলেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে আইওয়া ইতিমধ্যেই ‘ধ্বংসাত্মক মূল্য’ দিয়েছে। কুয়েতে ইরানি ড্রোনের হামলায় তাঁর রাজ্যের দুই সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক ভোটটি ছিল ইরান যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে তৃতীয়বারের মতো ভোট। এবার সাতজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। 

মিলার-মিকস, নান এবং মিশিগানের রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম ব্যারেট—যিনি গত সপ্তাহে তৃতীয়বারের মতো ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন-তাঁদের আসনকে নির্দলীয় কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট ‘টস-আপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ট্রাম্পের বিদেশি গরুর মাংস আমদানির পরিকল্পনাতেও আপত্তি জানিয়েছেন হিনসন ও উইসকনসিনের রিপাবলিকান গভর্নর প্রার্থী টম টিফানি। আমদানি বাড়িয়ে গরুর মাংসের দাম কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে গত মাসে হিনসন লিখেছিলেন, আইওয়ার গবাদিপশু খামারিরা ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের গরুর মাংস’ উৎপাদন করেন।

হিনসনের ভাষায়, বছরের পর বছর কঠিন বাজার পরিস্থিতির মুখে থাকা এসব খামারির জন্য আরও বেশি গরুর মাংস আমদানি অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। তাঁর মতে, উৎপাদকদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে আইওয়ার খামারিদের সহায়তা ও ভোক্তাদের ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।

টিফানিও সাংবাদিকদের বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি উইসকনসিনের কৃষকদের পাশে আছেন। উইসপলিটিকসের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশ থেকে আসা গরুর মাংস দিয়ে উইসকনসিনের কৃষকদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে-উইসকনসিনে যেমন, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও।’

গ্রেট লেকসের নাম নিয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন টিফানি। উইসকনসিন পাবলিক রেডিওকে তিনি বলেছেন, ‘গ্রেট লেকস, গ্রেট লেকসই থাকা উচিত এবং লেক সুপিরিয়র, লেক মিশিগান ও লেক অন্টারিও নামেই থাকা উচিত।’

গত মাসে প্রকাশিত মারকেট ল স্কুলের এক জরিপে উইসকনসিনের গভর্নর পদে টিফানি ও তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ডেভিড ক্রাউলির সমর্থন সমান দেখা যায়। নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৪ শতাংশ টিফানিকে এবং ৪৪ শতাংশ ক্রাউলিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আরও ১২ শতাংশ তখনও সিদ্ধান্ত নেননি।

ট্রাম্পের কাছ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ আসনের রিপাবলিকানদের দূরত্ব তৈরি করার ঘটনা ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন প্রেসিডেন্টের জনসমর্থনও কমেছে। ১৭ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ট্রাম্পের সামগ্রিক অনুমোদনের হার ছিল ৩২ শতাংশ-তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এটাই সর্বনিম্ন। 


ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার গত সপ্তাহে একটি কঠোর রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ট্রাম্প ‘খুব বেশি দূর’ চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া একই হিস্পানিক ভোটাররা এখন নিজেদের ‘প্রতারিত’ মনে করছেন।

রোববার সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে সালাজার বলেন, হিস্পানিক ভোটারদের বিষয়ে তাঁর সতর্কবার্তার প্রতি ট্রাম্প ‘খুবই ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছেন’।

নিউইয়র্কের রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক ললারও ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাবে তাঁর আসনটিও ‘টস-আপ’। এবিসি নিউজের জর্জ স্টেফানোপোলোস তাঁকে ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করবেন কি না জানতে চাইলে ললার বলেন, ‘আমি আমার ভোটারদের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করি, সব সময়ই করেছি।’

তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন এমন সব রিপাবলিকান প্রার্থী যে ট্রাম্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, তা নয়। কেউ কেউ বরং প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই আরও ঘনিষ্ঠভাবে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন।

উইসকনসিনের প্রতিনিধি ডেরিক ভ্যান অর্ডেনের আসনও কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট ‘টস-আপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নভেম্বরে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা কুকের বিপক্ষে লড়বেন তিনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে ভ্যান অর্ডেন বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ নেই।

ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনে অংশ নেওয়া ভ্যান অর্ডেন বলেন, ‘এখানকার তৃতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের মানুষ, উইসকনসিনের মানুষ এবং আমেরিকানদের জন্য আমি যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। আর তৃতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা একজন উগ্র সমাজতন্ত্রীকে তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে চান, সেটা তাঁদের ব্যাপার।’

নভেম্বরের ভোট যত এগিয়ে আসছে, তাই রিপাবলিকানদের সামনে প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা বা না-থাকার নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর প্রার্থীদের অনেকেই এখন জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, যুদ্ধের খরচ, জ্বালানির দাম, কৃষকদের স্বার্থ ও অভিবাসননীতির প্রভাব-সবকিছুর হিসাব মিলিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করছেন।