যুদ্ধের স্মৃতি পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ চায় আফগানিস্তান
ছবি-সংগৃহীতঅনলাইন ডেস্ক:
দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের অধ্যায় পেছনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আফগানিস্তানের তালেবান
সরকার। দেশটির খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত
জানানোর কথা জানিয়েছেন তালেবানের অন্তর্বর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল
টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুত্তাকি বলেন, আফগানিস্তান অর্থনীতির
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। তাঁর মতে,
দুই দেশের সম্পর্ককে গত ২০ বছরের সংঘাতের অভিজ্ঞতা দিয়ে না দেখে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার
সম্ভাবনার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মুত্তাকি আরও জানান, আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি উন্মুক্ত।
তবে তাঁর এই বক্তব্য সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে
আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু
বলেননি।
খনিজ সম্পদে বড় সম্ভাবনা
আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনাময় দেশ
হিসেবে পরিচিত। দেশটির আগের সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের করা ভূতাত্ত্বিক জরিপে
আফগানিস্তানে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে তামা, লোহা, কোবাল্ট, সোনা ও
লিথিয়াম। পাশাপাশি দেশটিতে রুপা, প্ল্যাটিনাম, ইউরেনিয়াম, জিঙ্ক, ট্যান্টালাম,
বক্সাইট, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য খনিজের মজুত রয়েছে।
বিশেষ করে তামা ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কারণে
আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সম্ভাবনাময় বাজার হতে পারে। তবে
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব সম্পদের বড়
অংশ এখনো বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
চীন-ইরানের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র?
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে খনিজ
খাতে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন চুক্তি করেছে বলে দাবি করছে আফগান সরকার। তালেবানের হিসাবে,
চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির মোট মূল্য ৭ বিলিয়ন ডলারের
বেশি।
এসব উদ্যোগের মধ্যে সোনা, মূল্যবান পাথর এবং ইস্পাত উৎপাদনে
ব্যবহৃত ক্রোমাইট উত্তোলনের প্রকল্প রয়েছে। চীন, পাকিস্তান, ভারত ও ইরানও
আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিদেশে আটকে
থাকা আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ছাড়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তালেবান
সরকার। আফগানিস্তানের মোট বৈদেশিক রিজার্ভের প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে
রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রে ছিল।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় বাধা
তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা তালেবানের জন্য
সহজ নয়। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর
তালেবানের কঠোর বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সেনা প্রত্যাহারের পর
তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ক্ষমতায় ফেরার আগে তারা আগের শাসনামলের
তুলনায় অপেক্ষাকৃত নমনীয়ভাবে দেশ পরিচালনার প্রত্যাশা তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে
নারী ও মেয়েদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে।
এর ফলে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে
এবং নারীদের কর্মক্ষেত্র ও চলাফেরার ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ এসেছে। জাতিসংঘের নারী
বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আফগানিস্তানের
একটি পুরো প্রজন্মের ওপর পড়ছে।
তালেবান অবশ্য দাবি করে আসছে, তাদের নীতিগুলো ইসলামি শরিয়াহ
আইন অনুযায়ী নারীদের অধিকার বিবেচনায় রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাগরাম নিয়ে অবস্থান অনড়
২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাশিয়াই একমাত্র দেশ, যে
আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক এখনো ঘনিষ্ঠ
নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি আবার
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে তালেবান এই দাবি
সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
মুত্তাকি বলেছেন, বাগরামসহ আফগানিস্তানের সব সামরিক ও
বেসামরিক স্থাপনা দেশের জাতীয় সম্পদ। তাই এসব স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের
হাতে তুলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে কাবুলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু
করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর কাবুলে মার্কিন
দূতাবাস বন্ধ হয়ে যায়।
মুত্তাকির দাবি, দূতাবাস এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে
এবং সেখানকার সড়ক সংস্কারসহ পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তালেবানের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে হোয়াইট হাউসের
পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর
আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখা
গিয়েছিল। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুদ্ধ ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। দেশটির খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে
সেই ব্যয়ের একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও তখন আলোচনা হয়েছিল।