মুসলিম ঐক্য ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র: খামেনি
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতি নষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতবা হোসেইনি খামেনি। তাঁর দাবি, তারা শুধু ইরান বা ইসলামি প্রতিরোধের বিরোধী নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বেরই শত্রু।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী এবং ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে রোববার দেওয়া এক বার্তায় এসব কথা বলেন খামেনি। এতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খামেনি বলেন, মুসলিমদের ঐক্য ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং পবিত্র কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সমাজে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও এসব পার্থক্যকে বিভেদের কারণ না বানিয়ে অভিন্ন বিষয়গুলোকে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
তাঁর মতে, মুসলিম বিশ্বের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এসেছে। ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কঠিন ও অস্থির সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সত্যের জয় এবং ইসলামের অগ্রগতির সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করেন তিনি।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হিসেবে মুসলিম ঐক্যের কথা উল্লেখ করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি বলেন, মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তাদের শক্তি কমে যায়। আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয় বাইরের শক্তি।
খামেনির অভিযোগ, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরিতে নানা ধরনের পার্থক্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মীয় মতপার্থক্যের পাশাপাশি জাতিগত, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পার্থক্যকেও বিভেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জেনে কিংবা না জেনে এমন কোনো কাজ করলে, যা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ ও সংঘাত বাড়ায়, তা শেষ পর্যন্ত ইসলামের শত্রুদের লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করে।
ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ
মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন খামেনি। তিনি প্রশ্ন করেন, মুসলিম দেশগুলো যদি একক ও শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারত, তাহলে ফিলিস্তিনিরা কি এতটা অরক্ষিত অবস্থায় নিপীড়নের শিকার হতো?
তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎও জড়িত।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ ও সরকারগুলো যদি ইসলামের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলত, তাহলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কেউ তাদের ভূখণ্ড ও সম্পদের দিকে লোভের চোখে তাকানোর সাহস পেত না।
ইসলামি দেশগুলোর নেতাদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খামেনি বলেন, তাদের প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করতে হবে এবং সেই শত্রুর পরিকল্পনা বুঝে তা মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের উদ্দেশে এই আহ্বান জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে সরাসরি অভিযুক্ত
খামেনি তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বন্ধুত্বের ‘শপথ করা শত্রু’ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দাবি, এসব শক্তি শুধু ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র, ইরানি জনগণ কিংবা ইসলামি প্রতিরোধের বিরোধিতা করে না। পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর জনগণসহ পুরো ইসলামি বিশ্বের প্রতিই তাদের বিরোধিতা রয়েছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে বিবেচিত মুসলিম দেশগুলোর নেতারাও তাদের চাপ বা অবমাননা থেকে মুক্ত নন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের উদ্দেশে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
খামেনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে ঐক্য, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উন্নয়ন-সব ক্ষেত্রেই মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
তাঁর মতে, এই সহযোগিতার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নতুন ইসলামি সভ্যতা গড়ে তোলা। মুসলিম ঐক্যকে সেই সভ্যতা প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখেন তিনি।
ইসলামি ঐক্য সপ্তাহের ইতিহাস
মুসলিম ঐক্যের এই ধারণাকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে তুলে ধরেন খামেনি। তিনি জানান, ১৯৭৮ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগের সময়ে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালনের ধারণা দেন।
তখন তিনি ইরানের ইরানশাহর শহরে নির্বাসিত ছিলেন। শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়ানোর এই উদ্যোগ পরে ব্যাপক সমর্থন পায়। ইসলামি বিপ্লবের পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
খামেনি বলেন, ইরানি জনগণের মধ্যে মুসলিম ঐক্যের একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। শত্রুদের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ঐক্য দুর্বল হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
ঐক্যের তিন শিক্ষা
মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ এড়িয়ে চলাকে ইসলামি শিক্ষার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করেন খামেনি। দ্বিতীয়ত, একে অপরকে রক্ষা করা এবং তৃতীয়ত, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ, নিরাপত্তা, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে মুসলিম সমাজগুলোর শক্তি বাড়বে এবং তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
খামেনি মুসলিম দেশগুলোর জনগণের প্রতিও অভ্যন্তরীণ বিভেদ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। বিশেষ করে ইরানের জনগণকে কোনো ধরনের বিভেদ সৃষ্টি হতে না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও তাঁর উত্তরসূরিদের জীবন থেকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, জ্ঞান, সততা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
বার্তার শেষ দিকে তিনি মুসলিম দেশগুলোর অগ্রগতি, মর্যাদা ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। তাঁর বক্তব্যে ইসলামি বিশ্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থানের ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।