৪৮ বছরে বিএনপি: ক্ষমতায় থেকে প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষা

 প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

৪৮ বছরে বিএনপি: ক্ষমতায় থেকে প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষা ছবি-সংগৃহীত


রোজিন ইসলাম:

৪৮ বছরে পা দিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলবিএনপি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আন্দোলন-সংগ্রাম, উত্থান-পতন ও নানা সংকট মোকাবিলা করে দলটি এখন আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই বিএনপির জন্য অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন তাৎপর্য বহন করছে। বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করাই এখন দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আজ ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি বর্তমানে পঞ্চমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি নিরাপদ ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তারেক রহমান দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এদিন তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া নিজের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বিএনপিকে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

প্রতিষ্ঠা থেকে নেতৃত্বের পরিবর্তন

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার সময় দলটি ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর নেতৃত্বে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও স্পষ্টভাবে তারেক রহমানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মৃতিচারণ, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়।

দলের নেতাদের মতে, ৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, আবার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেছে। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় জনগণের কাছে যে প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ এখন দলের জন্য বড় পরীক্ষা।

যে দর্শনকে সামনে রাখছে বিএনপি

বিএনপির নেতারা দলটির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন।

দলটির রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানের দর্শন ও কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ ও নৃগোষ্ঠীর মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করার ধারণাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার বিষয়টিও বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। জিয়াউর রহমানের সময় গ্রামীণ উন্নয়ন, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে দলটির নেতারা উল্লেখ করেন।

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, জনগণের ঐক্য এবং কল্যাণমুখী রাজনীতিকে আরও জোরালো করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার পর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর কাছে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলাদা আবেগ রয়েছে। তাঁর মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই দলের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে বিএনপির ইতিহাসে এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়ে দলটিকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখেন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ঐক্য ধরে রাখাকে তারেক রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন বিএনপির এই নেতা। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

রিজভীর মতে, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারাকে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে সমন্বয় করে সামনে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয়ের কথা খালেদা জিয়া বলতেন, সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশকে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

রাষ্ট্র পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী মনে করেন, বর্তমান সময়ে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোকে নতুন করে কার্যকর করা।

তাঁর মতে, দীর্ঘ সময়ের নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাতে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা কাঠামোকেও আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

অর্থনীতির পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতি ও উগ্র চিন্তার প্রভাব থেকে দূরে রেখে একটি মুক্ত, সুস্থ ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

ক্ষমতায় থেকেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা বিরোধী দল হিসেবে আন্দোলন পরিচালনা নয়, বরং ক্ষমতায় থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোএসব বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাইবে সাধারণ মানুষ।

এর পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে এবং নির্বাচনী ম্যান্ডেটকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সংস্কারে রূপ দেওয়া হবে, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পাঁচ দিনের কর্মসূচি

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

আজ সকালে শেরেবাংলানগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে শ্রদ্ধা জানাবেন বলে জানিয়েছেন রুহুল কবীর রিজভী।

এ ছাড়া নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন জেলা কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্ত কর্মসূচিও পালন করা হবে।

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এতে অংশ নেবেন।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বাইরে জেলা, মহানগর এবং বিএনপির বিভিন্ন ইউনিট ও অঙ্গসংগঠন নিজ নিজ উদ্যোগে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে।

নতুন বাস্তবতায় বিএনপি

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর বিএনপি এখন এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে, যখন দলটির সামনে অতীতের রাজনৈতিক অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব দায়িত্বও রয়েছে।

জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব পেরিয়ে এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের সময়ে দলের সাংগঠনিক ঐক্য, রাজনৈতিক আদর্শ এবং সরকারের কর্মদক্ষতাতিনটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবেগ ও ইতিহাসের বাইরে আগামী দিনের বিএনপির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং জাতীয় স্বার্থকে কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর।

৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি বহু রাজনৈতিক বাঁক পেরিয়েছে। এবার ক্ষমতায় থেকে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারাই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।