বন্যার আগে চীনের কাছে আগাম সতর্কতা চেয়েছিল নেপাল

 প্রকাশ: ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:২৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

বন্যার আগে চীনের কাছে আগাম সতর্কতা চেয়েছিল নেপাল ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ৮০০ মানুষ নিহত এবং তিন হাজারের বেশি নিখোঁজ হওয়ার আগে চীনের কাছে আরও আগাম তথ্য চেয়েছিল নেপাল। হিমবাহ, পানির স্তর ও আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য দুই দেশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

গত ২৭ মে কাঠমান্ডুতে নেপাল ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। নেপালের প্রস্তুত করা বৈঠকের আলোচ্যসূচি অনুযায়ী, বন্যা, আবহাওয়া ও হিমবাহ-সংক্রান্ত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি সেখানে আলোচনা হয়।

বৈঠকে হিমবাহের হ্রদের তালিকা তৈরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরিসহ যৌথভাবে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে বৈঠকের পর হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন নেপালের দুই কর্মকর্তা।

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ সৌহার্দ্র যোশি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, হিমবাহে বা সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো পরিবর্তন শুরু হলে সেটি আগেভাগে জানতে চায় নেপাল।

আরেক নেপালি কর্মকর্তা বিনোদ পরাজুলি জানান, বৈঠকে চীনা কর্মকর্তারা বলেছিলেন, নেপালের চাওয়া অনুযায়ী কোনো চুক্তি করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। এ বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন।

তবে নেপাল বা চীন—কোনো পক্ষই সাম্প্রতিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য একে অপরকে দায়ী করেনি। নেপালের কর্মকর্তারা বরং ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাস শনিবার জানিয়েছে, দুই দেশ এ বিষয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং মে মাসের বৈঠকে সীমান্তপারের দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে।

চীনা দূতাবাস আরও বলেছে, দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে চীনা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। দূতাবাসের দাবি, চীনা দল নেপালকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সময়মতো দিয়েছে।

গত বছরও একই এলাকায় একটি দুর্যোগের পর নেপাল একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছিল। তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে হঠাৎ পানি বেরিয়ে যাওয়ায় ওই বন্যায় নেপালে অন্তত নয়জন নিহত এবং আরও এক ডজনের বেশি মানুষ নিখোঁজ হন।

নেপালের কর্মকর্তা পরাজুলি বলেন, তিব্বতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে চীন সেই পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণের তথ্য দেয়। তবে তুষারধস, পানির স্তর, ভূমিধস কিংবা অন্য চরম দুর্যোগের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না।

চীন প্রায় এক মাস আগে থেকে তিব্বতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস নেপালের সঙ্গে উইচ্যাট ও ই-মেইলের মাধ্যমে ভাগাভাগি শুরু করেছে বলে জানান পরাজুলি।

দুর্যোগের ১২ দিন আগে সতর্কবার্তা

সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ১২ দিন আগে চীনের বিশ্ব আবহাওয়া কেন্দ্র ই-মেইলে নেপালের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল, ১৪ থেকে ১৯ আগস্ট ওই এলাকায় একটি মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাব পড়তে পারে।

বার্তায় নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার মতো একাধিক ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।

তবে ওই সতর্কবার্তায় হিমবাহ ধস বা পানির স্তরের তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। বুধবারের বিপর্যয় ঘটে একটি তুলনামূলকভাবে কম পর্যবেক্ষিত এলাকায় হিমবাহ ধসে। এর ফলে পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে কাদা, পানি ও পাথরের স্রোত নেমে আসে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করা স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক অস্টিন লর্ড মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় সীমিত হলেও সাম্প্রতিক দুর্যোগে এর ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

তবে তিনি বলেন, নেপাল ও চীনের মধ্যে দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের কোনো সুসংগঠিত ব্যবস্থা এখনো নেই। পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা ও সম্পদের দিক থেকে চীনের বিজ্ঞানীরা নেপালের তুলনায় অনেক এগিয়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সতর্কবার্তার সময়ই বদলে দিতে পারত পরিস্থিতি

বন্যার স্রোত নেপালে পৌঁছাতে যে সময় লেগেছে, তা কার্যকর আগাম সতর্কবার্তার গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে বলে মনে করেন নেপালের কর্মকর্তা পরাজুলি।

বুধবার নেপাল সময় সকাল ৮টা ৩২ মিনিটের দিকে তিব্বতের একটি সীমান্ত চৌকিতে বন্যার প্রচণ্ড স্রোত আঘাত হানে। ওই সময় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। নজরদারি ক্যামেরায় ধারণ করা ওই দৃশ্য এখন দুর্যোগটির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এর ২৬ মিনিট পর নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান পরাজুলিকে ত্রিশূলী নদীতে বন্যার খবর দেন। পরে তাঁর দল দেখতে পায়, সীমান্তের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের পর আর কোনো তথ্য পাঠাচ্ছে না।

নদীর ভাটির দিকের পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলো থেকেও তথ্য না আসায় ধারণা করা হয়, সেগুলো বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বন্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠায় নেপাল।

নেপাল সরকারের হিসাবে, সীমান্ত থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার ভাটিতে বন্যার স্রোত যাওয়ার পথে অন্তত চারটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। এই স্রোতে প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ ঘনমিটার পানি ছিল, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি।

বন্যার পানিতে বড় বড় পাথর ও ভবন ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক। নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্টিমসন সেন্টার।

চীনের সঙ্গে নতুন তথ্য বিনিময় চায় নেপাল

ভবিষ্যতে হিমবাহ ধস, তুষারধস এবং হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে চায় নেপাল।

নেপালের কর্মকর্তারা ভারতের সঙ্গে থাকা তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার মতো চীনের সঙ্গেও একটি চুক্তি করার প্রস্তাব দেবেন। এর আওতায় শুধু ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস নয়, বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির স্তর সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

নেপাল প্রতি ১০ মিনিটে এসব তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায়। পরাজুলির ভাষায়, এর লক্ষ্য একটাই-সময়মতো মানুষকে সতর্ক করা এবং ভবিষ্যতে কোনো দুর্যোগের আগাম সংকেত যেন আর বাদ না পড়ে।