সংবাদ শিরোনাম

ইয়েমেনে কি শেষ হচ্ছে ‘না যুদ্ধ, না শান্তির’ অচলাবস্থা?

 প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনে কি শেষ হচ্ছে ‘না যুদ্ধ, না শান্তির’ অচলাবস্থা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

চার বছর ধরে চলা ভঙ্গুর শান্তি কি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে ইয়েমেনে? সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং কঠোর যুদ্ধংদেহী বক্তব্যে নতুন করে সেই আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘ এক দশকের সংঘাতের পর আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটকবলিত দেশটি।

জুনের শেষ দিক থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী উভয় পক্ষই যোদ্ধা সমাবেশ শুরু করে। এর পর ৩ জুলাই এক দশকেরও বেশি সময় পর ইরান থেকে সানায় প্রথম প্রকাশ্য ফ্লাইট অবতরণ করে। ঘটনাটি নতুন উত্তেজনার জন্ম দেয়।

পরদিন পশ্চিম ইয়েমেনের হোদেইদা প্রদেশে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন, যা গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতা।

এরপর সোমবার সানার হুথি নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালায় ইয়েমেন সরকার। অভিযোগ, ইরানের আরেকটি বিমান সেখানে অবতরণের চেষ্টা করছিল। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরব লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাহের আল-আকিলি বলেন, সরকারের “ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে”। অন্যদিকে হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জানান, ইয়েমেনের “উত্তেজনা প্রশমনের অধ্যায় শেষ হয়েছে”।

২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইয়েমেনের যুদ্ধ কার্যত থমকে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রভাব ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন শঙ্কা

সানার বিমানবন্দরে হামলার জন্য হুথিরা সৌদি আরবকে দায়ী করলেও ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, হামলাটি তারাই চালিয়েছে।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক সালাহ আলী সালাহ বলেন, হুথিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু অভ্যন্তরীণ সমর্থন বাড়ানোর কৌশল নয়; বরং নতুন সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, “হুথিরা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে আবার যুদ্ধের দিকে এগোতে চাইছে—এমন বার্তা দিচ্ছে।”

তার মতে, হুথিদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতা তাদের উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছে। তারা চাইলে লোহিত সাগরের নৌপথও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

তবে নতুন করে যুদ্ধে জড়ালে হুথিদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। গত কয়েক বছরে ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে পড়েছে গোষ্ঠীটি। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার পর এসব হামলা চালানো হয়।

সালাহ বলেন, হুথিদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা জনগণের কাছে তুলে ধরা। কারণ দীর্ঘ সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও বাড়ছে।

যুদ্ধবিরতি থেকে আবার সংঘাতে?

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে তুলনামূলক শান্তি ফিরেছিল। কিছু সময়ের জন্য সানা বিমানবন্দর থেকেও বেসামরিক বিমান চলাচল শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধ না থাকায় অর্থনৈতিক সংকটের দায় বাইরের শক্তির ওপর চাপানো হুথিদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করেছে। গত বছরের শেষ দিকে হুথিবিরোধী জোটের অন্যতম অংশ দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল পরাজিত হওয়ার পর সরকারের অবস্থান আরও শক্ত হয়।

ইয়েমেন বিশ্লেষক আদেল দাশেলা বলেন, হুথিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তিনি বলেন, “হুথিরা যদি শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেই থাকে, তাহলে সামরিক বিকল্প সামনে থাকছে। তবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে সৌদি আরবের অবস্থানের ওপর।”

২০২৩ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘের একটি রোডম্যাপে সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ, সড়ক ও বিমানবন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানি পুনরায় চালু এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি।

এখন দুই পক্ষই সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কঠোর ভাষায় একে অপরকে হুমকি দিচ্ছে।

ইয়েমেন সরকারের সামরিক মুখপাত্র আবদো মাজালি বলেন, ইরান থেকে সানায় আসা ফ্লাইট প্রমাণ করে তেহরান এখনো হুথিদের ব্যবহার করে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে হুথি নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি আল জাজিরাকে বলেন, সানা বিমানবন্দরে হামলার জবাবে ইয়েমেনেরও সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে আঘাত হানার এবং অবরোধ আরোপের অধিকার রয়েছে।

অচলাবস্থায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ

সানায় হুথিরা নতুন করে হাজার হাজার যোদ্ধাকে প্রস্তুত করছে। হুথির জনপ্রিয় কমিটির সদস্য আলী মোহাম্মদ জানান, সংঘাত শুরু হলে এসব যোদ্ধা অংশ নিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া যোদ্ধাদের সামনের সারির লড়াইয়ের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

গত এক দশকের যুদ্ধে ইয়েমেনে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যুদ্ধের পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ ও রোগেও বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। প্রায় ২৬ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫৮ শতাংশ কমেছে।

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও ব্যর্থ শান্তি আলোচনায় ক্লান্ত ইয়েমেনিরা এখন দ্রুত একটি সমাধান চায়।

সানার সরকারি স্কুলের শিক্ষক আবদুল্লাহ বলেন, কে বিজয়ী হবে সেটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তার ভাষায়, “যে পক্ষই জিতুক, তাদের দায়িত্ব হবে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি করা, অর্থনৈতিক সংকট দূর করা এবং দেশকে স্থিতিশীল করা। যুদ্ধের দ্রুত ও চূড়ান্ত সমাপ্তি দরকার।”

সূত্র:আলজাজিরা